মানুষের ইচ্ছা কি স্বাধীন?

মানুষের ইচ্ছা কি স্বাধীন?

কিশোর রায়,
কিশোর রায়, পি এইচ ডি স্কলার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
Posted on ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

দর্শনের একটি মূল প্রশ্ন হল আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা আছে না নেই? দার্শনিকদের মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই আলোচনা প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত: নির্ধারণবাদ এবং স্বাধীনতাবাদ। নির্ধারণবাদীরা যুক্তি দেন যে যাবতীয় ঘটনা (মানুষের কর্মকাণ্ডগুলি সহ), প্রকৃতির নিয়মেই পূর্ববর্তী কারণ (বা ঘটনা) দ্বারা নির্ধারিত। সেখানে প্রকৃত স্বাধীন ইচ্ছার কোন জায়গা নেই। এই মত অনুযায়ী, স্বাধীন ইচ্ছা একটি মায়া, কারণ সমস্ত ঘটনাই ঘটে পূর্ববর্তী ঘটনাগুলির পরিণাম স্বরূপ। যেকোনো ঘটনা পূর্ববর্তী কোনো ঘটনার সাথে কার্য-কারণ সম্পর্কে যুক্ত। স্বাধীনতাবাদীরা কিন্তু মনে করেন যে মানুষ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে, বাহ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে। এই প্রবন্ধটিতে মুলত দুজন নির্ধারণবাদী বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করব।

হার্ভার্ডের পাখিবিজ্ঞানী এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট মায়র (Ernst Mayr), বিশ শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় জুড়ে পাখিদের পর্যবেক্ষণ করার পর, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে তারা একপ্রকার ছোট রোবোটিক যন্ত্র। ১৯৮৮ সালে তিনি লিখেছিলেন যে পাখি এবং অন্যান্য প্রাণী কম্পিউটারের চেয়ে বেশি উদ্দেশ্যপূর্ণ নয়: তারা তেমনই আচরণ করে যেমনটা তাদের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। তাদের নিশ্চিতভাবেই উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হয় যখন তারা ইঁদুর শিকার করে, ছানাদের কাছে কেঁচো ধরে নিয়ে যায় কিংবা ছোট ছোট বাসা তৈরি করে। মায়র -এর এই দৃষ্টিভঙ্গি, নির্ধারণবাদকে সমর্থন করে।

এবার প্রশ্ন হল, কীভাবে প্রাণীদের আচরণ নির্ধারিত হয়? মায়র-এর উত্তর হলো, পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীদের প্রোগ্রাম করা হয়েছে জিন দ্বারা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। প্রাকৃতিক নির্বাচন এমন ধরনের জিনগত আচরণভিত্তিক প্রোগ্রামকে পুরস্কৃত করে যা সুস্থতা বাড়ায় ও বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। যেমন খাদ্য, শত্রু বা সঙ্গীর প্রতি দ্রুত এবং সঠিক প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তোলা। মায়র আচরণী প্রোগ্রামে বিশ্বাস করতেন। এটি বাদে অন্যান্য ব্যাখ্যাগুলোকে তিনি অতিপ্রাকৃত বলে বাতিল করেছিলেন। তিনি সেগুলো ভুল প্রমাণ করার জন্য সময়ও ব্যয় করতে চাননি। তিনি প্রশ্নাতীত ভাবে মানতেন যে, জিনগত আচরণ প্রাকৃতিকভাবেই প্রোগ্রাম করা।

স্ট্যানফোর্ডের একজন বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং প্রাইমেটোলজিস্ট, রবার্ট সাপোলস্কি  তার  “ডিটারমিন্ড : এ সায়েন্স অফ লাইফ উইদাউট ফ্রি উইল’’ বইতে এ যুক্তি দেন যে শুধু প্রাণীরাই নয়, মানুষেরাও পূর্বনির্ধারিত যন্ত্রের মতো। তিনি বলেন যে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা মানে একথা মেনে নেওয়া যে স্বাধীন ইচ্ছার অস্তিত্ব নেই। জীবদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডই জৈবিক এবং পরিবেশগত নির্ধারকের দ্বারা পরিচালিত। প্রকৃত অর্থে আমরা কিছুই স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছয় বিশ্বাসটিকে সাপোলস্কি  চ্যালেঞ্জ করেন।

তাঁর যুক্তি, মানুষের আচরণ সম্পূর্ণরূপে জেনেটিক, পরিবেশগত, এবং জৈবিক কারণের জটিল আন্তঃক্রিয়ার দ্বারা নির্ধারিত। আমাদের কর্মকাণ্ড সচেতন সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং অসংখ্য প্রভাবের ফল যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।  সকল ঘটনাই (যার মধ্যে মানুষের কর্মকাণ্ডও রয়েছে) পূর্ববর্তী কারণ দ্বারা নির্ধারিত। সাপলস্কি  মায়রের সাথে একমত যে বিবর্তন প্রধান প্রক্রিয়া। মানুষ বিবর্তনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিকশিত হয়েছে। তবে, তিনি আরও যোগ করেন যে স্বল্পমেয়াদী কারণগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। নিউরন, জিন, এপিজেনেটিক্স, গর্ভ, পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র, হরমোন, গন্ধ, ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়গুলি  আচরণ নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। যেমন কাদের থেকে আপনি জন্মেছেন এবং জন্মের সময় কেমন যত্ন নেওয়া হয়েছিল, জন্মের সময় কোন ডাক্তার প্রথমে আপনাকে আপনার মায়ের কাছে দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এমন আরও অনেক কারণ আছে। এই সমস্ত কারণগুলো একত্রে মানব আচরণ সম্পূর্ণরূপে নির্ধারণ করে। তাঁর মতে, আমরা আমাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কারণ আমাদের জেনেটিক গঠন,  আমাদের ব্যক্তিত্ব, আমাদের পছন্দ এবং প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। তবে, তিনি জোর দেন যে জেনেটিক্সই সবকিছু নয়, পরিবেশগত কারণগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের প্রারম্ভিক যত্ন ও লালন-পালনের ধরন  এবং অভিজ্ঞতাগুলো আচরণ তৈরি করার পেছনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। তিনি গর্ভকালীন নির্ধারক, যেমন মায়ের মানসিক চাপ ও পুষ্টির প্রভাবও বিশ্লেষণ করেন। তিনি পরিবেশের প্রভাব নিয়েও আলোচনা করেন, যার মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও অন্তর্ভুক্ত। ব্যাখ্যা করেন, কিভাবে সমাজের নিয়ম, মূল্যবোধ, এবং প্রত্যাশা আমাদের কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তিনি বন্ধুদের প্রভাবও বিশ্লেষণ করেন এবং দেখান কিভাবে আমাদের চারপাশের মানুষগুলো আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে।

তাঁর এই বইটিতে তিনি মানব আচরণের জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো (বিশেষত মস্তিষ্ক এবং তার কার্যকলাপ) বিশ্লেষণ করেছেন। ব্যাখ্যা করেছেন, কিভাবে নিউরাল কার্যকলাপ এবং মস্তিষ্কের গঠন আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, এবং কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। তিনি নিউরোট্রান্সমিটার এবং হরমোনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন এবং  ব্যাখ্যা করেন কিভাবে মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তন আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে। সাপলস্কি নিউরোপ্লাস্টিসিটি-এর ধারণাটিও ব্যাখ্যা করেছেন, যা মস্তিষ্কের অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিবর্তন এবং মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নির্দেশ করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন কিভাবে শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা মস্তিষ্ককে পুনর্গঠন করে এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। সাপলস্কি জোর দিয়ে  বলেন যে, আচরণ হলো বিভিন্ন কারণের জটিল আন্তঃক্রিয়ার ফল। কোনো একক কারণ সম্পূর্ণরূপে মানব আচরণকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। জেনেটিক, পরিবেশগত, এবং জৈবিক প্রভাবের আন্তঃক্রিয়াকে বিবেচনা করেই মানুষের আচরণ বোঝা সম্ভব। তিনি ‘স্বাধীন ইচ্ছার ধারণাটিকে’ পুনর্বিবেচনা করতে বলেন।

নির্ধারণবাদ এবং স্বাধীনতাবাদ -এর বিতর্ক মানব অস্তিত্বের প্রকৃতি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার জন্ম দেয়। তা আমাদের কর্মের ভিত্তিকে, আমাদের সমাজের কাঠামো এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আমরা নির্ধারণবাদ বা স্বাধীন ইচ্ছার ধারণা যেটাতেই বিশ্বাস করি না কেন, বিষয়টি দর্শন এবং বিজ্ঞানের গভীর এবং জটিল একটি বিষয়। আমাদের ইচ্ছা কী স্বাধীন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে, এই বিষয় সম্পর্কিত পরবর্তী লেখাগুলিতে, অন্যান্য দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীদের ধারণা ব্যাখ্যা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 2 =