মেসোস্ফিয়ারে হেলেন ঝড়ের দাপট

মেসোস্ফিয়ারে হেলেন ঝড়ের দাপট

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬

আমেরিকার ফ্লোরিডার উপকূলে যখন ঘূর্ণিঝড় হারিকেন হেলেন আছড়ে পড়ে, তখন দৃশ্যটা ছিল পরিচিত। প্রবল বাতাস, অঝোর বৃষ্টি, ভাঙা ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞ শুধু মাটিতেই থেমে থাকেনি। ঝড়ের আসল কীর্তি ধরা পড়ে এমন এক জায়গায়, যেখানে মানুষের চোখ সহজে পৌঁছানোর কথা নয়। পৃথিবীর মাথা ছাড়িয়ে প্রায় ৫৫ মাইল উঁচুতে, মহাশূন্যে।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ধরা পড়ে এক অজানা ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় তরঙ্গ, যার জন্ম ঘূর্ণিঝড় হেলেনের আঘাতে। এগুলি এমন তরঙ্গ, যা আকাশে তাকিয়ে কেউ দেখতে পায় না। পৃথিবীর ভয়ংকর আবহাওয়া যে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বায়ুমণ্ডলের অনেক উপরের স্তরে, তারই প্রমাণ এটি। ঘটনাস্থল হলো মেসোস্ফিয়ার। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩১ থেকে ৫৫ মাইল উপরে অবস্থিত এক শীতল রহস্যময় স্তর। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই স্তর আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক রাখে না। কিন্তু হেলেনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটল। যেদিন এই ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আছড়ে পড়ে, সেদিনই নাসার যন্ত্রপাতিতে ধরা পড়ে এই অদ্ভুত তরঙ্গের ইশারা। নাসার বিজ্ঞানী মাইকেল টেলর বলেন, “এই পর্যবেক্ষণ আমাদের ভাবনার দিগন্ত বদলে দিচ্ছে। এতদিন আমরা ভাবতাম ঝড় শুধু ভূপৃষ্ঠেরই বিষয়। এখন বোঝা যাচ্ছে, ঝড়ের প্রভাব আকাশের পাতলা বাতাসেও ঢেউ তোলে”। এই আবিষ্কারের নেপথ্যে রয়েছে Atmospheric Wave Instrument (AWE) নামক যন্ত্র। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বাইরে বসানো এই যন্ত্রটি তৈরি করা হয় “বায়ুমণ্ডলীয় আভা” ধরার জন্য। হেলেন আঘাত হানার সময়, AWE এমন কিছু নকশা রেকর্ড করে, যা দেখতে জলে পড়া পাথর থেকে তৈরি ঢেউয়ের মতো। সেই ঢেউ উপকূল ছাড়িয়ে পশ্চিমের দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। মহাকাশ থেকে দেখার সুবিধাটাই এখানে আসল। পৃথিবীর মাটিতে বসে এমন সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরা পড়ে না। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে AWE নীচের ঝড় আর উপরের বায়ুমণ্ডলের মধ্যে সেতু খুঁজে বের করে। এটি শুধু বাতাস, বৃষ্টি বা বজ্রপাত দেখে না, দেখে সেই বিশৃঙ্খলা কীভাবে ধাপে ধাপে ওপরে উঠে যায়। এই তথ্যগুলি কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ মেসোস্ফিয়ারের বাতাস খুব পাতলা হলেও তার প্রভাব বাস্তবে অনেক। এইসব ছোট ছোট তরঙ্গ বায়ুর ঘনত্বে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে। আর মহাকাশ প্রযুক্তির জগতে “সামান্য” পরিবর্তন মানে বড় ঝুঁকি। উপগ্রহর গতিপথ ঠিক রাখতে বাতাসের ঘনত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ হলে উপগ্রহ কক্ষপথ হারাতে পারে। যোগাযোগ উপগ্রহ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, এমনকি জিপিএস সবই নির্ভর করে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর।

 

এই গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে Advanced Mesospheric Temperature Mapper (AMTM) নামের দূরবীক্ষণ ব্যবস্থা। এটি এতটাই সংবেদনশীল যে, মেসোস্ফিয়ারের -১৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার মধ্যেও ক্ষুদ্র অবলোহিত সংকেত ধরতে পারে। সাধারণ সেন্সর যেখানে ব্যর্থ, সেখানে AMTM অদৃশ্য ঘটনাকে দৃশ্যমান করে। আগে এসব ছিল কেবলই অনুমান। এখন আছে তথ্য। AWE আর AMTM মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা পাচ্ছেন এমন এক জানালা, যেখান দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, পৃথিবীর ঝড় আর উপরের আকাশ আসলে একে অপরের সঙ্গে বাঁধা। ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের ঝড়ের সময় AWE এই সূক্ষ্ম সংকেত রেকর্ড করবে। প্রতিটি নতুন তথ্য সাহায্য করবে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে, উপগ্রহকে নিরাপদ রাখতে।

 

সূত্র: International Space Station instrument observes something unknown 55 miles above Earth; earth. Com.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 10 =