রজঃনিবৃত্তি হল ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। এসময় নারীদেহের কিছু হরমোনের পরিবর্তনের ফলে তাদের মাসিক চক্র বরাবরের মতো বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ এটি একটি নারীর সন্তানধারণ ক্ষমতা বা প্রজনন পর্যায়ের সমাপ্তি নির্দেশ করে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রজঃনিবৃত্তি নারীদের মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। নারীদের মস্তিষ্কে সূক্ষ্ম কিন্তু বিস্তৃত গঠনগত পরিবর্তন ঘটে, বিশেষ করে স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ হ্রাস পায়। এই উপসর্গগুলির উপশমের জন্য অনেকসময় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির মাধ্যমে ক্রমহ্রাসমান ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোন প্রতিস্থাপন করা হয়ে থাকে।
এই গবেষণাপত্রটি গত ২৬শে জানুয়ারি সাইকোলজিক্যাল মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচ আর টি)-এর প্রভাবও বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, এইচ আর টি মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন বা মানসিক সমস্যাগুলি ঠেকাতে না পারলেও, প্রতিক্রিয়ার প্রবণতা কিছুটা ধীর করতে পারে। এই গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ইউ কে বায়োব্যাংক -এর প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়—রজঃনিবৃত্তির আগে, রজঃনিবৃত্তি-পরবর্তী কিন্তু হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচ আর টি) গ্রহণ না-করা নারী, এবং রজঃনিবৃত্তি-পরবর্তী এইচ আর টি গ্রহণকারী নারী। মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম, জীবনযাপন ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রায় ১১ হাজার নারীর এম আর আই স্ক্যান ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কাঠামোগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়।
দেখা যায়, রজঃনিবৃত্তি-পরবর্তী নারীরা উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় বেশি ভোগেন এবং এসব সমস্যার জন্য চিকিৎসা গ্রহণের হারও তুলনামূলকভাবে বেশি। অনিদ্রা, কম ঘুম এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি তাঁদের জীবনে নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে। যদিও প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল এইচ আর টি গ্রহণকারী নারীদের মানসিক সমস্যা বেশি, গভীর বিশ্লেষণে জানা যায়—এই মানসিক প্রবণতাগুলি অনেকের ক্ষেত্রেই রজঃনিবৃত্তির আগেই বিদ্যমান ছিল।
বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার ক্ষেত্রে গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, স্মৃতিশক্তিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য না থাকলেও প্রতিক্রিয়ার গতি রজঃনিবৃত্তির পর দ্রুত কমে যায়। বিশেষ করে এইচ আর টি না-নেওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব স্পষ্ট। তবে এইচ আর টি গ্রহণকারী নারীদের মধ্যে এই ধীরগতির প্রবণতা কিছুটা কম দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে থেরাপিটি বার্ধক্যজনিত কিছু স্নায়বিক পরিবর্তনকে আংশিকভাবে মন্থর করতে পারে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার হলো—হিপোক্যাম্পাস, এন্টোরাইনাল কর্টেক্স ও অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্সে গ্রে ম্যাটার হ্রাস। মস্তিষ্কের এই অঞ্চলগুলো স্মৃতি সংরক্ষণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মনোযোগ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র। এবং আলঝেইমার রোগে এগুলোই প্রাথমিক আঘাতপ্রাপ্ত এলাকা।
গবেষকদের মতে, রজঃনিবৃত্তি নারীদের ভবিষ্যৎ জীবনে স্মৃতি হারানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় কেন বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে এই রোগের হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তাই রজঃনিবৃত্তি কালীন সময়ে নারীদের শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সংবেদনশীলতা, সামাজিক সমর্থন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
সূত্র: “Emotional and cognitive effects of menopause and hormone replacement therapy” 26th January 2026, Psychological Medicine.
DOI: 10.1017/S0033291725102845
