
প্রশান্ত মহাসাগরের নির্জন রেকোহু চাথাম দ্বীপপুঞ্জে কয়েক লক্ষ বছর আগে এক প্রজাতির হাঁসের পূর্বপুরুষ ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছিল দ্বীপের পরিবেশ অনুযায়ী। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই পরিবেশে সে রূপ নেয় এক শক্তপোক্ত, স্থলজীবী প্রজাতিতে। তার ডানা ক্রমে ছোট হতে থাকে, পা হয় লম্বা ও মজবুত। অল্প কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যেই এই প্রজাতি উড়ানের পথ ছেড়ে ভূমি-কেন্দ্রিক জীবনে প্রবেশ করে। বিলুপ্ত এই হাঁস আজ দ্বীপভিত্তিক বিবর্তনের অধ্যায়ে নতুন আলোকপাত করছে। সম্প্রতি ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয় দলের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে এই নতুন প্রজাতির খবর। প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ ও হাড়ের বিস্তারিত পরিমাপের সমন্বয়ে বিজ্ঞানীরা বর্ণনা করেছেন এক সম্পূর্ণ অজানা শেলডাক প্রজাতি- টাডর্না রেকোহু বা রেকোহু শেলডাক। দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের রক্ষক হোকোটেহি মোরিওরি ট্রাস্ট, এই নামকরণ করেছে। গবেষণাপত্রের সহ-লেখক নিক রলেন্স জানিয়েছেন, রেকোহু হাঁসের ডানা ছোট ও বলিষ্ঠ, আর পায়ের হাড় দীর্ঘ ও দৃঢ়। যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয়, এই প্রজাতি ধীরে ধীরে ওড়ার রাস্তা ছেড়ে স্থলজ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এটি ছিল একেবারেই যুক্তিসম্মত অভিযোজন। রেকোহু দ্বীপে খাদ্যের প্রাচুর্য ছিল, আর ভূমিজ শিকারি প্রায় অনুপস্থিত। কিন্তু প্রবল বাতাসের কারণে উড়ান হত ঝুঁকিপূর্ণ ও শক্তিক্ষয়ী। গবেষক পাস্কাল লুব্বে মন্তব্য করেছেন, “উড়ান শক্তি-ব্যয়ী একটি প্রক্রিয়া। যদি প্রয়োজন না থাকে, তবে উড়তে হবে কেন?” তিনি আরও যোগ করেন, ওড়ার জন্য ছোট ডানার ক্ষেত্রে অধিক শক্তি প্রয়োজন হত। আর লম্বা মজবুত পা সেই শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করত। গবেষকরা এই প্রজাতির কাহিনি গড়ে তুলেছেন দুটি প্রমাণের উপর নির্ভর করে। প্রথমত, তারা চাথাম দ্বীপের জীবাশ্ম থেকে প্রাচীন মাইটোকন্ড্রিয়া ডিএনএ বের করে বর্তমান প্রজাতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, মাথার খুলি, ডানা ও পায়ের হাড়ের আকৃতি ও অনুপাত বিশ্লেষণ করেছেন। ফলাফল একত্র করলে দেখা যায়, রেকোহু শেলডাক নিউজিল্যান্ডের মূল ভূখন্ডের পরিচিত প্যারাডাইস শেলডাক (Tadorna variegata)-এর নিকটতম আত্মীয়। তা সত্ত্বেও আকার-আকৃতিতে স্পষ্টত ভিন্ন। ডিএনএ বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রায় ৩,৯০,০০০ বছর আগে, প্লাইস্টোসিন যুগের শেষ দিকে তাদের পূর্বপুরুষ চাথাম দ্বীপপুঞ্জে বসতি স্থাপন করে। সেই দীর্ঘ সময় দ্বীপের বিচ্ছিন্ন পরিবেশ ধীরে ধীরে তাদের শরীরের গড়ন বদলে দেয়। চাথাম দ্বীপ নিউজিল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৭৮৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। দ্বীপটি বহু অনন্য প্রজাতির পাখির জন্মস্থান। মানুষের আগমনের আগে এখানে অন্তত আটটি প্রজাতির জলচর পাখি প্রজনন করত। হাঁস থেকে রাজহাঁস ও মারগ্যানসার পর্যন্ত। দ্বীপজীবনে প্রায়ই দেখা যায় তথাকথিত “দ্বীপ লক্ষণ নিচয় ”। অর্থাৎ ডানা ছোট হওয়া, পা মজবুত হওয়া ও ভূমিজ জীবনে অভিযোজিত হওয়া। রেকোহু শেলডাক তারই এক স্পষ্ট উদাহরণ। এই প্রজাতির খুলি ছিল তুলনামূলক লম্বা ও সরু, সামনের অঙ্গ ছোট, আর পিছনের অঙ্গ বড় ও শক্তিশালী। যা প্রমাণ করে, এরা ভূমিতে হাঁটা ও খাদ্য অনুসন্ধানে বেশি সময় কাটাত। হাড়ের অনুপাত বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ডানার তুলনায় এদের পায়ের শক্তির উপর নির্ভরতা বেশি ছিল। তবুও এরা পুরোপুরি উড়ান-অক্ষম নয়, বরং “উড়ান-হ্রাসপ্রাপ্ত” অবস্থায় ছিল। প্রবল বাতাসতাড়িত দ্বীপে সেটাই এক যুক্তিসম্মত সমঝোতা। তবে মানুষের আগমনের পর এই হাঁস টিকতে পারেনি। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, মোরিওরি জনগোষ্ঠীর প্রাচীন খাদ্যভাণ্ডার বা ‘মিডেন’-এ এই হাঁসের হাড় পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত শিকার, পরবর্তী আবাসস্থল পরিবর্তন ও বাইরের শিকারি প্রাণীর আগমনে এই প্রজাতি উনবিংশ শতক নাগাদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবুও আবিষ্কারটির তাৎপর্য গভীর। হোকোটেহি মোরিওরি ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী লেভি লানাউজে বলেছেন, “এটি শুধু রেকোহুর জন্যই নয়, বরং ইমি মোরিওরিদের অতীত ধনসম্পদের সঙ্গে পুনঃসংযোগের প্রতীক।” টাডর্না রেকোহুর বর্ণনা স্পষ্ট করল কীভাবে দ্বীপ পরিবেশ, দ্রুত প্রজাতির শরীর ও আচরণ বদলে দিতে পারে। এ থেকে জানা যায়, চাথাম দ্বীপের জলচর পাখির বৈচিত্র্য আজকের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ ছিল। একই সঙ্গে, প্রাচীন ডিএনএ ও হাড়ের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ মিলিয়ে দীর্ঘদিনের বর্গীকরণ সংক্রান্ত (ট্যাক্সোনমিক) ধাঁধা সমাধান করা যায়। রেকোহু থেকে প্রতিটি নতুন প্রজাতির সন্ধান দ্বীপের বসতি, অভিযোজন ও বিলুপ্তির সময়রেখা আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। একই সঙ্গে এ থেকে দেখা যায়, বিজ্ঞান ও স্থানীয় সম্প্রদায় কীভাবে একত্রে কাজ করতে পারে। এর নামকরণে প্রতিফলিত হয়েছে রক্ষকের ভূমিকা ও বংশপরম্পরার স্মৃতি।
সূত্র : Ancient DNA and morphometrics reveal a new species of extinct insular shelduck from Rēkohu Chatham Islands by
Nicolas J Rawlence , et.al ; Zoological Journal of the Linnean Society (Volume 204, Issue 3) (25 July 2025).