
দেহের নানান কোষকলায় অনেক পুরোনো সংক্রমণের সঙ্গে জড়িত জীবাণুরা শান্তভাবে লুকিয়ে বসে থাকে। এই লীন পর্যায়ে তাদের কাজকর্ম নিয়ে গবেষণা করবার মতো কোনো প্রাকৃতিক মডেল এতদিন ছিল না। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুচিকিৎসা বিভাগের পরিচালনায় একটি গবেষক দল এ বিষয়ে গবেষণায় নেমেছেন। তাঁরা কাজ করেছেন টক্সোপ্লাজমা গোন্ডাই নামক এক পরজীবী নিয়ে। গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক প্রফেসর ক্রিস্টোফার হান্টার লিখেছেন, মস্তিষ্কের সংক্রমণে টক্সোপ্লাজমা গোন্ডাই পরজীবীটির পুঁজকোষ বা সিস্টগুলিকে অবশ্যই নিশানায় আনা সম্ভব, এমনকি সাফ করে দেওয়াও সম্ভব। ‘নেচার মাইক্রোলজি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি থেকে জানা গেছে, পুঁজকোষগুলি কীভাবে পরজীবী আর পোষকের পারস্পরিক জীবনধারণকে মদত দেয়।
লীন পর্যায়ে এই পরজীবীটি মস্তিষ্ককোষের মধ্যে দীর্ঘায়ু পুঁজকোষ তৈরি করে, যার দৌলতে পরজীবীটি পোষকের রোগপ্রতিরোধতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলতে পারে। কিন্তু কয়েকটি বিশেষ ধরণের শ্বেতকণিকা (টি-সেল) পুঁজকোষ সংবলিত মস্তিষ্ককোষকে নিশানায় আনতে পারে, যার ফলে পরজীবীটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সুসাধ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু তার জন্য একটা মূল্য ধরে দিতে হয়। পুঁজকোষ যদি না-গজিয়ে থাকে, তাহলে পরজীবীর বোঝা আরও ভারি হয়ে উঠবে, যা মস্তিষ্কের ক্ষতি করবে। অর্থাৎ এখানে একটা ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপার আছে। পরজীবীটা পোষকের মধ্যে আসন গাড়বে ঠিকই, কিন্তু তার পাল্লা এত বেশি প্রসারিত হবে না যাতে পোষকের ক্ষতি হয়। কারণ পোষক মরে গেলে রোগজীবাণু তো খাবারই পাবে না। সুস্থ দেহে এই পরজীবীটির রোগলক্ষণ সচরাচর প্রকট হয় না। কিন্তু পশুদের রোগপ্রতিরোধতন্ত্র দুর্বল হলে, কিংবা গর্ভবতী দশায় এ থেকে টক্সোপ্লাজমোসিস রোগ হয়। সংক্রমিত খাবার খেলে, আধ-কাঁচা মাংস খেলে এ রোগ হতে পারে। বেড়ালের মলই যেহেতু একমাত্র মাধ্যম যেখানে এই পরজীবী যৌন প্রজনন ঘটাতে পারে, তাই বেড়াল-মলের সংস্পর্শে এলেও এ রোগ হওয়া সম্ভব। রোগপ্রতিরোধতন্ত্র-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এতদিনকার চালু ধারণার সঙ্গে এর তফাত আছে। কারণ এখন জানা যাচ্ছে যে মস্তিষ্ককোষ মোটেই এই রোগজীবাণুর পরম নিশ্চিন্ত আশ্রয় নয়। আবার রোগপ্রতিরোধতন্ত্র এদের একেবারে সাফ করেও দিতে পারে না। কারণ ইঁদুরদের দেহে ছ মাস পরেও এদের শনাক্ত করা যায়। এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। স্বতন্ত্রভাবে গাণিতিক মডেল বানিয়েও দেখা গেছে, পরীক্ষার এই ফলাফল মিলে গেছে। বোঝা গেছে, টক্সোপ্লাজমা গোন্ডাই-এর ওপর রোগপ্রতিরোধতন্ত্রের চাপেই পুঁজকোষগুলির সংখ্যা বাড়ে-কমে। আসল যে-আণবিক কৌশলে পরজীবীটি এইভাবে লুকিয়ে পড়তে পারে, সেটিকে শনাক্ত করেছেন এম আই টি-র জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান লৌড়িডো। পরজীবীটি যদি পুঁজকোষ বানাতে না-পারে তাহলে কী হবে, সেটা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যানিটা কোশী দেখিয়েছেন, মস্তিষ্কের কিছু কিছু কোষ এ রোগ হতে নিজেদের বাঁচাতে পারে। এই মডেলের সাহায্যে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের কিছু কিছু সংক্রমণ সম্বন্ধে ধারণাও উন্নত হবে বলে মনে হয়।
সূত্র: University of Pennsylvania. “Understanding the immune response to a persistent pathogen.” ScienceDaily, 28 March 2025.