লাদাখের হানলের লাল আকাশ

লাদাখের হানলের লাল আকাশ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

লাদাখের হানলে। সেখানকার রাতের আকাশ সাধারণত এক নিখুঁত নীল ক্যানভাস। ঘন নীলে ভেসে থাকা গ্যালাক্সি-পুঞ্জ, শহুরে কোলাহল থেকে বহু দূরে অবস্থিত নিঃশব্দ এক মহাজাগতিক দুনিয়া। কিন্তু জানুয়ারি ১৯ ও ২০-এর রাতে সেই আকাশ জুড়েই দেখা যায় এক অস্বাভাবিক, রক্তিম আভা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে “ভারতে নর্দার্ন লাইটস” শিরোনামে। মোহময় ছবি, বিস্ময়ের প্রতিক্রিয়া, রোম্যান্টিক ক্যাপশন। কিন্তু বিজ্ঞানের চোখে এই আলো নিছক কোনো সৌন্দর্যের উৎসব নয়, বরং এক সতর্ক সংকেত। এই লাল অরোরার উৎস, ২০০৩ সালের পরবর্তী শক্তিশালী সৌর বিকিরণ ঝড়। ১৮ই জানুয়ারি, সূর্য থেকে ছিটকে বেরোয় এক্স-ক্লাস সৌর অগ্নিশিখা। সূর্যের সবচেয়ে বিধ্বংসী বিস্ফোরণগুলোর একটি। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে এক বিশাল চৌম্বক প্লাজমার মেঘ, যাকে বলা হয় ‘করোনাল মাস ইজেকশন’। এটি সূর্যের গ্যাস ও চৌম্বক ক্ষেত্রের এক দৈত্যাকার বুদবুদ, যা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে অবিশ্বাস্য গতিতে। এই প্লাজমা মেঘ পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার গতিতে। মাত্র ২৫ ঘণ্টায় পৌঁছে যায় আমাদের গ্রহের চৌম্বক ঢালে। সংঘর্ষের ফলে ঘটে ‘G4 স্তরের ভূ- চৌম্বক ঝঞ্ঝা’, আর তাতে পৃথিবীর চৌম্বক বলয় মারাত্মকভাবে ক্ষয়ে যায়। লাল রঙের রহস্যও এটাই। সূর্য থেকে আসা উচ্চ-শক্তির কণাগুলো পৃথিবী থেকে ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চতায় থাকা অক্সিজেন পরমাণুদের উত্তেজিত করে তোলে। মেরু অঞ্চলে আমরা সাধারণত সবুজ অরোরা দেখি। কিন্তু লাদাখের মতো নিম্ন অক্ষাংশে তা হয়ে যায় লাল। ইসরোর সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, আমরা এখন সূর্যের ‘সোলার ম্যাক্সিমাম’-এর দিকে এগোচ্ছি। এ হল সূর্যচক্রের সেই পর্যায়, যখন বিস্ফোরণ ও ঝড়ের সংখ্যা বেড়ে চলে। হানলের অল-স্কাই ক্যামেরা এই সৌরঝঞ্ঝার তরঙ্গ ধরতে পেরেছে। জানুয়ারি ২০২৬-এর এই ঘটনাটি ছিল S4 স্তরের এক তীব্র বিকিরণ ঝঞ্ঝা, সূর্য থেকে আসা উচ্চ-শক্তির প্রোটনের প্রবল প্রবাহ। নাসা ও ইসরো দু’পক্ষই দেখেছে, কীভাবে এই ঝড় পৃথিবীর চৌম্বক ঢালকে চেপে ধরে। আদিত্য-L1 মিশনের তথ্য জানাচ্ছে, এমন সময়ে পৃথিবীর চৌম্বক সীমানা এতটাই সঙ্কুচিত হয়ে যায় যে ভূ – সাপেক্ষে স্থির উপগ্রহগুলো সাময়িকভাবে খোলা সৌরঝড়ের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। ভারতের মতো দেশের জন্য এই ঘটনা নিছক মহাকাশবিজ্ঞান নয়, এটি একটি উচ্চ-ঝুঁকির সতর্কবার্তাও। তীব্র ভূ-চৌম্বক ঝঞ্ঝা বিদ্যুৎ গ্রিডে বিপজ্জনক প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে, ঘটাতে পারে ব্ল্যাকআউট। এ সময় উপরের বায়ুমণ্ডল ফুলে ওঠে, কক্ষপথ থেকে উপগ্রহ ছিটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। জিপিএস, ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা সবই এই সৌরঝড়ের নিশানায়। এই সাম্প্রতিক ঝড়ের সময় এমনকি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীদেরও আশ্রয় নিতে হয়েছে অতিরিক্ত বিকিরণের কারণে। সমাধান কোথায়? ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পূর্বাভাস ও সহনশীল প্রকৌশলের উপর। আদিত্য-L1 মিশনের মাধ্যমে ভারত এখন মহাকাশ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে নিজের স্থান শক্ত করছে। L1 লাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে বসে থাকা এই সৌরপ্রহরী CME পৃথিবীতে পৌঁছনোর ২৪–৪৮ ঘণ্টা আগেই সতর্কবার্তা দিতে পারে। এতে উপগ্রহদের নিরাপদ মোডে নেওয়া যায়, বিদ্যুৎ গ্রিডে লোড ব্যালান্স করে ট্রান্সফরমারে আগুন এড়ানো সম্ভব হয়। মাটিতে চলছে গ্রিড শক্তিশালী করার কাজ। জিওম্যাগনেটিকালি ইনডিউসড কারেন্ট সেন্সর বসানো হচ্ছে, যাতে বাস্তব ক্ষেত্রে বিপদ ধরা পড়ে। এই ব্যবস্থায় হানলের ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপগ্রহ প্রেরিত তথ্য যাচাই করতে ভূমি-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য। তাই হানলের ‘ডার্ক স্কাই রিজার্ভ’-কে আলো দূষণ থেকে রক্ষা করা বিশেষ প্রয়োজন। ভারতের প্রথম “ডার্ক স্কাই স্যাংচুয়ারি” হিসেবে হানলে আমাদের মহাবিশ্ব দেখার জানালা। কিন্তু বাড়তে থাকা পর্যটন আর কৃত্রিম আলো যদি এই অন্ধকারকে গ্রাস করে, তাহলে আমরা আগাম সতর্কতার এই ব্যবস্থাটিকে হারাব। লাল আকাশ দেখতে অপূর্ব। কিন্তু আমাদের এই ইলেকট্রনিক সভ্যতা যে ভঙ্গুর, যতটা আমরা স্বীকার করতে চাই, তার চেয়ে অনেক বেশি ভঙ্গুর।

 

সূত্র: Why the red sky over Ladakh’s Hanle is a warning India can’t ignore; India Today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + thirteen =