লিন মার্গুলিস: সহযোগিতাভিত্তিক বিবর্তনের বিপ্লবী প্রবক্তা 

লিন মার্গুলিস: সহযোগিতাভিত্তিক বিবর্তনের বিপ্লবী প্রবক্তা 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৭ মার্চ, ২০২৬

বিশ্বপ্রসিদ্ধ বিবর্তনী জীববিজ্ঞানী লিন মার্গুলিস (বা লিন পেট্রা আলেকজান্ডার) ১৯৩৮ সালের ৫ মার্চ, শিকাগো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। একটি ইহুদি পরিবারে চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। বাবা মরিস ছিলেন একজন আইনজীবী ও ব্যবসায়ী, আর মা লিওনা একটি ট্রাভেল এজেন্সির পরিচালক। তদানীন্তন শিক্ষাব্যবস্থার মানদণ্ডে তিনি ছিলেন খারাপ ছাত্রী, স্কুলে প্রায়ই শাস্তি পেতেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় খারাপ ছাত্রী হিসেবে চিহ্নিত এই মেয়েটিই পরবর্তী কালে আধুনিক বিবর্তন তত্ত্বের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

খুব অল্প বয়স থেকে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। মাত্র ১৫ বছর বয়সে University of Chicago Laboratory Schools-এ ভর্তি হন, ১৯ বছর বয়সে স্নাতক হন। ঐ বছরেই বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগানকে বিয়ে করেন। কার্ল ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু থেকেই ছিল অশান্তিময়। সংসার, সন্তান ও গবেষণার ভার একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তিনি এক প্রবল সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যান। লিন যখন দুই সন্তানের মা হয়ে পিএইচ ডি করার চেষ্টা করছেন, তখন কার্ল আশা করতেন তিনি পুরোপুরি গৃহিণীর ভূমিকা পালন করবেন। শেষ পর্যন্ত এই চাপ ও দ্বন্দ্বের মাঝে ১৯৬৫ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও লিন কিন্তু নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিয়ে যান। ওই একই বছরে তিনি উইস্কনসিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক্স আর জুওলজিতে মাস্টার্স এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

পরে তিনি আবার বিয়ে করেন কেলাসবিজ্ঞানী নিকোলাস মার্গুলিসকে । তখন থেকে তিনি সারা জীবন স্বামীর পদবী মার্গুলিস ব্যবহার করেন। এরপর শুরু হয় তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি অণুজীব , বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটিস্টা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এক যুগান্তকারী ধারণা উপস্থাপন করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে কেন্দ্রকযুক্ত ইউক্যারিওটিক কোষের (যেমন- মানুষের কোষ) ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব ডিএনএ আছে এবং তারা ব্যাকটেরিয়ার মতো আচরণ করে। এখান থেকেই জন্ম নেয় তার বিখ্যাত এন্ডোসিম্বায়োসিস তত্ত্ব।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোটি কোটি বছর আগে স্বাধীনভাবে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থান গড়ে তোলে এবং ধীরে ধীরে একত্রিত হয়ে জটিল কোষ তৈরি করে। অর্থাৎ, বিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে। এই ধারণা সেই সময়কার প্রচলিত নব্যডারউইনবাদের বিরোধী ছিল। যেখানে বিবর্তনকে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল হিসেবে দেখা হত।

তাই লিনের এই ধারণা তৎকালীন বৈজ্ঞানিক সমাজের কাছে ছিল প্রায় অগ্রহণযোগ্য। ১৯৬৬ সালে লিন তার গবেষণাপত্র “On the Origin of Mitosing Cells” প্রকাশের জন্য বিজ্ঞানের জার্নালে পাঠান। কিন্তু একের পর এক মোট ১৫ বার তার কাজ প্রত্যাখ্যাত হয়। একজন সমালোচক তো তাঁর গবেষণাকে অর্থহীন বলেও আখ্যা দেন। তবুও মার্গুলিস হাল ছাড়েননি। অবশেষে ১৯৬৭ সালে ‘’Journal of Theoretical Biology’’ তার প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। কিন্তু তাতেও তৎক্ষণাৎ স্বীকৃতি আসেনি। প্রায় এক দশক ধরে তার ধারণা উপেক্ষিত হয়।

লিন মার্গুলিসের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার মনোবল। তিনি নিজের গবেষণার প্রতি বিশ্বাস রেখে কাজ চালিয়ে যান। অবশেষে ১৯৭৮ সালে রবার্ট শোয়ারৎজ এবং মার্গারেট ডেঅফ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্ট সত্যিই ব্যাকটেরিয়া থেকে উদ্ভূত। ১৯৮০-এর দশকের জিন গবেষণাও এই তত্ত্বকে সমর্থন করল। ফলে এন্ডোসিম্বায়োসিস তত্ত্ব মূলধারার বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠা পেল। এখানে মূলত তিনি দেখান যে জীবনের জটিলতা তৈরি হয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহাবস্থানের মাধ্যমে। তার বিখ্যাত উক্তি— “প্রাণ পৃথিবীকে লড়াই করে নয়, যোগাযোগ-জাল বানিয়ে অধিকার করেছে।” তাঁর কাজ এই দর্শনেরই প্রতিফলন। পরে তিনি জেমস লাভলকের-এর গাইয়া তত্ত্বপ্রকল্পেরও একজন প্রবল সমর্থক ছিলেন। এই ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী নিজেই একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত জীবন্ত ব্যবস্থা, যেখানে জীব ও পরিবেশ একত্রে কাজ করে ভারসাম্য বজায় রাখে।

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৩ সালে National Academy of Sciences-এর সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁর হাতে National Medal of Science তুলে দেন। এটি বিবর্তনবিদ্যায় সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি। তাঁর একদা তীব্র সমালোচক রিচার্ড ডকিন্সও পরে তাঁর অধ্যবসায় ও সাহসের প্রশংসা করেন।

মার্গুলিস চিরকালই ছিলেন এক বিদ্রোহী বিজ্ঞানী। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি প্রচলিত অনেক বৈজ্ঞানিক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন – যেমন, এইচআইভি ও এইডসের সম্পর্ক। এই নির্ভীক মনোভাবই তাঁকে একই সঙ্গে বিতর্কিত ও অসাধারণ করে তুলেছিল।

২০১১ সালের ২২ নভেম্বর, ম্যাসাচুসেটসের অ্যামহার্স্টে তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। আজকের দিনে, এন্ডোসিম্বায়োসিস তত্ত্ব জীববিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ধারণা হিসেবে পড়ানো হয়। আজ আমরা জানি, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষই আসলে একসময়কার স্বাধীন জীবের সমন্বয়ে গঠিত এক জীবন্ত সহযোগিতার উদাহরণ।

লিন মার্গুলিস আমাদের শিখিয়েছেন যে, জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা। তিনি প্রমাণ করেছেন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে শুধু মেধা নয়, সাহস ও অধ্যবসায়ও প্রয়োজন। বহু প্রত্যাখ্যান, সমালোচনা এবং বিরোধিতার মধ্যেও তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন।

বিবর্তনী ইতিহাসের প্রকৃত সত্যকে এত সহজ ও সাবলীলভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য লিন মার্গুলিস চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

One thought on “লিন মার্গুলিস: সহযোগিতাভিত্তিক বিবর্তনের বিপ্লবী প্রবক্তা 

  1. Barun Bhattacharya

    সুন্দর লেখা। এরকম একজন বৈজ্ঞানিক কে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =