লিভার ফাইব্রোসিস-এ ওষুধ যুগল

লিভার ফাইব্রোসিস-এ ওষুধ যুগল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬

লিভার ফাইব্রোসিস এক নীরব রোগ। কিন্তু এর পরিণতি মারাত্মক। বিশ্বের কয়েকশো কোটি মানুষ এই ধীরে-ধীরে গড়ে ওঠা ক্ষতের ভার বইছেন। এঁরা নিজেরা অনেকেই সেকথা জানেনও না। বছরের পর বছর ভাইরাল হেপাটাইটিস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল, বিপাকজনিত অসুখ, বিষাক্ত রাসায়নিক বা অটোইমিউন আক্রমণে লিভার যখন বারবার আঘাত পায়, তখন শরীরের স্বাভাবিক সারানোর প্রক্রিয়াই উল্টো পথে হাঁটে। তৈরি হয় ক্ষত। সেই ক্ষতই একদিন সিরোসিস, লিভার বৈকল্য বা ক্যানসারে রূপ নেয়। অথচ অনেক দশকের গবেষণার পরেও লিভার ফাইব্রোসিসের জন্য একটিও অনুমোদিত অ্যান্টিফাইব্রোটিক ওষুধ নেই। এই অচলাবস্থার মাঝেই নতুন আলো ফেলেছে চীনের ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষক হং ওয়াং ও হাইপিং হাও-এর দল। তাদের গবেষণা দেখাচ্ছে, একটি নয়, দুটি পুরোনো ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করলে লিভার ফাইব্রোসিসে, মেরামতের কাজ অনেক গভীরে পৌঁছায়। লিভার ফাইব্রোসিসের কেন্দ্রে রয়েছে হেপাটিক স্টেলেট সেল (HSC)। সুস্থ অবস্থায় এরা ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু লিভার আঘাত পেলেই জেগে ওঠে। কোলাজেন বানাতে শুরু করে, আর সেই কোলাজেনই ধীরে ধীরে লিভারকে শক্ত, অনমনীয় ও অকেজো করে তোলে। এই রূপান্তর নিয়ন্ত্রিত হয় একাধিক জটিল সংকেত প্রেরণ পথের মাধ্যমে। সমস্যা এখানেই। একটি পথ বন্ধ করলে অন্যটি সক্রিয় হয়ে যায়। তাই একক নিশানা ওষুধ প্রায়ই ব্যর্থ হয়। এই কারণেই গবেষকদের আগ্রহ বেড়েছে সম্মিলিত থেরাপির দিকে। একাধিক জৈবিক পথকে একসঙ্গে সামাল দেওয়াই হতে পারে সমাধান।

গবেষণার প্রথম ধাপে বিজ্ঞানীরা নজর দেন সিলিবিনের দিকে। একটি প্রাকৃতিক যৌগ, যা বহুদিন ধরে লিভার- সুরক্ষক হিসেবে ব্যবহৃত। ল্যাব ও প্রাণী পরীক্ষায় দেখা যায়, সিলিবিন লিভার কোষকে বাঁচিয়ে রাখে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়, প্রদাহজনিত সংকেত দমন করে। এটি বিষাক্তও নয়। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, এটা কি সরাসরি ক্ষত তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারে? উত্তর হতাশাজনক। মানব ও ইঁদুরের ক্ষত-উৎপাদক কোষে সিলিবিন কেবল সামান্য মাত্রায় ফাইব্রোসিস-সম্পর্কিত জিন কমাতে পেরেছে, যেমন- COL1A1, COL1A2, ACTA2, ও TGFB । ইঁদুরে কার্বন টেট্রাক্লোরাইড দিয়ে সৃষ্ট ফাইব্রোসিসেও উন্নতি ছিল সীমিত। স্পষ্ট হয়ে যায়, সিলিবিন মূলত লিভারকে রক্ষা করে, কিন্তু স্টেলেট সেলের ইঞ্জিন থামাতে পারে না। এখানেই আসে মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত। গবেষকরা সিলিবিনকে একা না রেখে জুড়ে দেন আরও ৩৯৭টি FDA-অনুমোদিত ওষুধের সঙ্গে। একটি বিশেষ স্ক্রিনিং পদ্ধতিতে খোঁজা হয়, কে হতে পারে এর আদর্শ সঙ্গী? সবচেয়ে শক্তিশালী নামটি উঠে আসে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে। কারভেডিলল সাধারণত হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ হিসেবে পরিচিত। এই বিটা-ব্লকার, সিলিবিনের সঙ্গে মিলে যেন নতুন রূপ নেয়। গবেষণাগারে মানব ও ইঁদুরের কোষে এই যুগলবন্দি, কোলাজেন উৎপাদন প্রায় স্তব্ধ করে দেয়, স্টেলেট সেলকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। প্রাণী পরীক্ষায় আরও স্পষ্ট হয় ছবি। ৫০:১ অনুপাতে (সিলিবিন:কারভেডিলল) এই যুগলবন্দি সবচেয়ে শক্তিশালী ফল দেয়। লিভারের ক্ষতি, প্রদাহ ও ক্ষত, সবই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এমনকি অনেক গবেষণায় ব্যবহৃত রেফারেন্স ড্রাগ অবেটিকোলিক অ্যাসিডকেও কার্যকারিতায় ছাড়িয়ে যায় এই জুটি। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা একসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। ফলে যে প্রক্রিয়া স্টেলেট সেলকে বারবার ক্ষত বানানোর নির্দেশ দেয়, তা বন্ধ হয়ে যায়। এই সংকেত প্রেরণ পথ বন্ধ হলেই ফাইব্রোসিসের চাকা থেমে যায়। সিলিবিন ও কারভেডিলল দুটিই আগে থেকেই ব্যবহৃত, নিরাপদ, সস্তা ও পরিচিত ওষুধ। সুতরাং নতুন করে শূন্য থেকে ওষুধ বানানোর দরকার নেই। ফলে এই যুগলবন্দি দ্রুত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পৌঁছানোর বাস্তব সম্ভাবনা রাখে। এই গবেষণা শুধু লিভার ফাইব্রোসিসের জন্য নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্যও একটি বার্তা দেয় – পুরোনো ওষুধকে নতুন চোখে দেখলে চিকিৎসার মানচিত্র বদলে যেতে পারে।

 

সূত্র: “Combination of silybin and carvedilol synergistically alleviates liver fibrosis by inhibiting Wnt/β-catenin signaling ” by An Chen, Xiaochai Zhu, Houzhe Jiang, Maosheng Gong, Shuang Cui, Guangji Wang, Hong Wang and Haiping Hao, 24 November 2025, Targetome.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + 7 =