লেজার আলোয় তরল অণুর নাচ

লেজার আলোয় তরল অণুর নাচ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ জানুয়ারী, ২০২৬

তরল দেখতে যতই শান্ত মনে হোক, তার ভিতরে চলছে নিরন্তর অদৃশ্য কম্পন। অণুরা একে অপরের চারপাশে ঘুরছে, ধাক্কা খাচ্ছে, বন্ধন তৈরি করছে আবার ভেঙেও যাচ্ছে। জীবকোষের ভিতরে এই তরল পরিবেশেই প্রোটিন, আর এন এ আর অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার কাজ চলে। কিন্তু এতদিন বিজ্ঞানীরা এই তরল জগতের গভীরে ঠিক কী ঘটে, তা সরাসরি দেখতে পারছিলেন না। এবার সেই অদৃশ্য জগতের দরজা খুলতে শুরু করেছে। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এক বিশেষ লেজার পদ্ধতি ব্যবহার করে তরলের ভেতরের আণবিক মিথস্ক্রিয়া ধরা যায়। কঠিন পদার্থের মতো তরলের নির্দিষ্ট আকার বা গঠন নেই। তার উপর তরলের ভিতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক ঘটনাগুলো ঘটে অত্যন্ত দ্রুত, এক সেকেন্ডের অতি সামান্য ভাগের এক ভাগ সময়ে। সাধারণ পরীক্ষার যন্ত্র এই গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। ফলে তরল দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের কাছে এক রকম “অন্ধ বিন্দু” হয়ে ছিল। এই সমস্যার সমাধানে গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন হাই-হারমনিক স্পেকট্রোস্কপি (HHS)। এতে অত্যন্ত শক্তিশালী ও অতি ক্ষুদ্র সময়ের লেজার পালস (স্পন্দ) দিয়ে অণুর ভিতর থেকে ইলেকট্রনকে মুহূর্তের জন্য বের করে আনা হয়। ইলেকট্রন যখন আবার ফিরে আসে, তখন যে আলো বেরোয়, তাতেই লুকিয়ে থাকে অণুর ভিতরের গতিবিধির খবর। এই পদ্ধতি এতটাই দ্রুত যে এক সেকেন্ডের একশো কোটি কোটি ভাগের এক ভাগের , অর্থাৎ অ্যাটোসেকেন্ডের ঘটনাও ধরা পড়ে। এত দ্রুত সময়ে সাধারণ স্পেকট্রোস্কপি এ কাজ করতে পারে না। তরলের ক্ষেত্রে সমস্যা দু’টি। এক, তরল নিজেই উৎপন্ন আলো অনেকটা শুষে নেয়। দুই, অণুগুলির অনবরত নড়াচড়া করায় সংকেত বিশ্লেষণ জটিল হয়ে ওঠে। গবেষকেরা এর সমাধানে তৈরি করেন অতি-পাতলা তরল স্তর। এতে আলো সহজে বাইরে বেরোতে পারে। আর এই পদ্ধতিতেই প্রথম প্রমাণ পাওয়া গেছে, তরলের ভিতরে কী কাজ করে। নতুন কাঠামোয় গবেষকেরা মিথানলের সঙ্গে বিভিন্ন হ্যালোবেঞ্জিন মিশিয়ে পরীক্ষা চালান। এই সব অণু দেখতে প্রায় এক। পার্থক্য শুধু একটি পরমাণুতে। সাধারণত এই মিশ্রণগুলির আলোর আচরণ সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু ফ্লুরোবেঞ্জিন–মিথানল মিশ্রণ একেবারে আলাদা আচরণ দেখায়। এই মিশ্রণে আলোর উৎপাদন কমে যায়। এমনকি একটি নির্দিষ্ট আলোর তরঙ্গ পুরোপুরি হারিয়ে যেতেও দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি ছিল বড় চমক। অর্থাৎ মিথানল আর ফ্লুরোবেঞ্জিনের মধ্যে এমন কিছু ঘটছে, যা ইলেকট্রনের চলাচল সরাসরি বদলে দিচ্ছে। কম্পিউটার সিমুলেশন দেখাল, ফ্লুরোবেঞ্জিনের ফ্লুরিন পরমাণু মিথানলের সঙ্গে বিশেষ ধরনের হাইড্রোজেন বন্ড তৈরি করে। এই বন্ধনের ফলে তরলের ভিতরে এক বিশেষ গঠন তৈরি হয়। অন্য হ্যালোবেঞ্জিনগুলির ক্ষেত্রে কিন্তু এমন সাজানো বিন্যাস দেখা যায় না। এই বিশেষ গঠনই ইলেকট্রনের পথে এক ধরনের বাধা তৈরি করে। ফলে ইলেকট্রন ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না, আর তার প্রভাব পড়ে উৎপন্ন আলোতে। বেশিরভাগ জৈব ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াই ঘটে তরল পরিবেশে, যথা ওষুধের কাজ, কোষের ক্ষতি, এমনকি বিকিরণের প্রভাব। সবেতেই ইলেকট্রনের ভূমিকা আছে। তাই তরলের ভিতরে ইলেকট্রন কীভাবে ছড়ায় ও ধাক্কা খায়, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তরলের ভেতরের অদৃশ্য জগতেও চোখ রাখা সম্ভব। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও উপাদান বিজ্ঞানের বহু জটিল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

 

সূত্র: Solvation-induced local structure in liquids probed by high-harmonic spectroscopy. Proceedings of the National Academy of Sciences, 2025; 122 (48) DOI

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × four =