ল্যাবে প্রাণী ব্যবহার কমছে 

ল্যাবে প্রাণী ব্যবহার কমছে 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ মার্চ, ২০২৬

যুক্তরাজ্য সরকার গত নভেম্বরে এক জোরালো ঘোষণা করে- ল্যাবে প্রাণী ব্যবহার কমানোর পথরেখা। এ বছরই বন্ধ হবে ত্বকের পরীক্ষায় প্রাণী ব্যবহার। ২০৩০-এর মধ্যে কুকুরের উপর করা কিছু গবেষণাও বড় কাটছাঁটের মুখে। সরকারি নীতিপত্রে বক্তব্য স্পষ্ট- “ব্যতিক্রম ছাড়া বিজ্ঞানে প্রাণীর ব্যবহার হবে না”। এই সুরে সুর মিলিয়েছে অন্যরাও। গত এপ্রিলে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন জানায়, ওষুধের নিরাপত্তা ও বিষাক্ততা পরীক্ষায় ৩–৫ বছরের মধ্যে প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষা হবে “ব্যতিক্রম, আবশ্যিক নয়”। একই সময়ে মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থাসমূহ গবেষণায় প্রাণী-নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ ঘোষণা করে। আর এ বছরই ইউরোপীয় কমিশন রাসায়নিক নিরাপত্তা যাচাইয়ে প্রাণী-পরীক্ষা বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নৈতিকতা ও প্রাণী-কল্যাণের প্রশ্ন বহুদিন ধরেই চাপ তৈরি করছিল। এখন সেই চাপকে ত্বরান্বিত করছে বিকল্প বিজ্ঞানের ঝড়। যাদের বলা হচ্ছে ‘নিউ অ্যাপ্রোচ মেথডোলজি’ (NAMs)। মাইক্রোফ্লুইডিক চ্যানেলে মানবকোষ বসিয়ে বানানো চিপ, থ্রিডি অর্গানয়েড, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কম্পিউটেশনাল মডেলের ব্যবহার, ল্যাবের চেহারা বদলে দিচ্ছে। অ্যানিম্যাল-ফ্রি রিসার্চ ইউকে-এর বিশ্লেষণ বলছে, ২০০৬ থেকে ২০২২ এর মধ্যে শুধু NAMs নির্ভর বায়োমেডিক্যাল গবেষণাপত্র প্রায় ২৫ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে এক লাখ। চীনও পিছিয়ে নেই। ২০২৪-এ চালু হয়েছে মানব অঙ্গের রোগ-প্রক্রিয়া অনুকরণ ব্যবস্থা। ২৬৪০ মিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগে মানব অঙ্গের রোগ-প্রকৃতি নকলের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। সমর্থকদের দাবি, মানুষকে বোঝার জন্য মানুষের কোষই সেরা আয়না। বোস্টনের জৈব-অনুপ্রাণিত প্রকৌশলবিষয়ক উইস ইনস্টিটিউট-এর বায়োইঞ্জিনিয়ার ডোনাল্ড ইংবার বলেন, এই পরিবর্তন “অনেক দেরিতে” এসেছে। তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এমুলেট বানিয়েছে ‘লিভার-চিপ’। এটি ইউএসবি স্টিকের মতো ছোট এক ডিভাইস, যেখানে মানব যকৃতের কোষে ওষুধের বিষাক্ততা ধরা যায়। ২০২২-এর এক গবেষণায় ৮৭% নির্ভুলতায় লিভার-ক্ষতিকর যৌগযুক্ত ১২টি ওষুধও ধরা পড়েছে, যেগুলো প্রাণী-মডেলে নিরাপদ ভেবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে চলে গিয়েছিল। ২০২৪-এ এই প্রযুক্তি FDA-র মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের পাইলট কর্মসূচিতে জায়গা পায়। তবু উচ্ছ্বাসের মাঝেও রয়েছে সতর্কতা। জীববিজ্ঞান জটিল। পুরো অঙ্গতন্ত্র, হরমোন-প্রজনন নেটওয়ার্ক, বার্ধক্য সবকিছু চিপে তোলা কঠিন। ওয়াশিংটনের গবেষকেরা বানিয়েছেন কিডনি-চিপ, যা তীব্র কিডনি আঘাতের কিছু দিক নকল করে। কিন্তু যেখানে মানব কিডনিতে দু ডজনেরও বেশি ধরনের কোষ রয়েছে সেখানে এই কিডনিতে রয়েছে মাত্র এক ধরনের কোষ। “রিডাকশনিস্ট” পদ্ধতি দিয়ে হয়ত গভীরে দেখা যায়, তবে পুরো চিত্র পাওয়া অনেকসময়ই সম্ভব হয় না। অর্গানয়েডও এগোচ্ছে দ্রুত। ২০২১-এ iPSC থেকে মানব লিভার অর্গানয়েড বানিয়ে ২৩৮টি বাজারজাত ওষুধে বিষাক্ততা যাচাই করে উচ্চমাত্রায় নির্ভুলতা পাওয়া গেছে। ৪৩০টি রাসায়নিকের মানব-ইঁদুর-ল্যাব তথ্য দিয়ে তৈরি ভার্চুয়াল স্কিন-সেনসিটাইজেশন টেস্ট গত বছর আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় স্বীকৃতি পেয়েছে। এমনকি FDA-র গবেষকেরা ‘অ্যানিম্যাল জিএ এন’ নামের জেনারেটিভ এআই বানিয়ে ১ লক্ষ ভার্চুয়াল ইঁদুরের লিভার বিষাক্ততার মাত্রা নির্ণয় করেছে। এতে শিল্পও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাসেল-এর রোশ সংস্থা মানব-মডেল সিস্টেমে ওষুধ উন্নয়নের গতি বাড়াতে, ২০২৩-এ চালু করেছে মানব জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে নতুন ওষুধ অনুমোদনে প্রাণী-ডেটা এখনও প্রায় বাধ্যতামূলক, তবু বিকল্প তথ্য ব্যবহারে নিয়ন্ত্রকদের “খোলামেলা মনোভাব” বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ‘ঢেউ উঠতে শুরু করেছে’। যুক্তরাজ্যে ২০১৫-র ৪.১৪ মিলিয়ন থেকে ২০২৪-এ প্রাণী-প্রক্রিয়াকরণ কমে হয়েছে ২.৬৪ মিলিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নরওয়েতে ২০১৮–২০২২-এ এই সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ৫%। তবু বাস্তবতা কঠিন। প্রায় ৬৭% প্রক্রিয়ায় ইঁদুর বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণী, আর বহু ওষুধ প্রাণী-মডেলে সফল হলেও মানুষের ট্রায়ালে ভেঙে পড়ে। প্রায় ৮৬% পরীক্ষাধীন ওষুধ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। সেপসিসে শতাধিক প্রতিশ্রুতিময় থেরাপি ইঁদুরে কাজ করলেও মানুষের শরীরে কার্যকর হয়নি। কারণ আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা আলাদা, আর রোগের চেহারা ব্যক্তিভেদে বদলায়। সবচেয়ে বড় বাধা যাচাইকরণ বা‘ভ্যালিডেশন’। কোন মডেল কতটা নির্ভুল, পুনরুৎপাদনযোগ্য, নিয়ন্ত্রক-গ্রাহ্য, সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে সময় আর খরচ দুটোই বেশি লাগে। তাই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভ্যালিডেশন সেন্টার ও নেটওয়ার্ক গড়ছে। মানব অর্গানয়েড তৈরিতে কোটি কোটি ডলার ঢালছে। সুতরাং প্রাণী-পরীক্ষার যুগ ফুরোতে চলেছে। তবে রাতারাতি নয়। NAMs আশার আলো, তাদেরও একই রকম কঠোরতা, স্বচ্ছতা আর প্রমাণের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। বিজ্ঞান এগোয় ধাপে ধাপে। হয়তো ভবিষ্যৎ ল্যাবে খাঁচা কমবে, চিপ বাড়বে।

 

সূত্র : Nature 650, 812-814 (2026)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 5 =