ল্যাবে বানানো কোয়ান্টাম ‘ওয়ার্মহোল’ সুড়ঙ্গ 

ল্যাবে বানানো কোয়ান্টাম ‘ওয়ার্মহোল’ সুড়ঙ্গ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ মার্চ, ২০২৬

এই প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ‘ওয়ার্মহোলের’ একটি সিমুলেশন তৈরি করলেন। এ হল মহাকাশ বিজ্ঞানের সেই কল্পিত সুড়ঙ্গ, যা মহাবিশ্বের দুই দূরবর্তী বিন্দুকে মুহূর্তের মধ্যে যুক্ত করতে পারে। ‘ওয়ার্মহোল’ বহু বছর ধরে পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ আর বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পাতায় বন্দি ছিল। বাস্তবে তার অস্তিত্ব আছে কি না, তা এখনও অজানা। কিন্তু নতুন গবেষণা থেকে দেখা যায়, অন্তত গাণিতিকভাবে এমন এক মহাজাগতিক সুড়ঙ্গের আচরণ নিয়ে এখন ল্যাবরেটরির ভিতরেই পরীক্ষা করা সম্ভব। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিজ্ঞানীরা কিন্তু সত্যিই মহাকাশে কোনো গর্ত খোলেননি। আসলে তারা এমন একটি কোয়ান্টাম সিস্টেম তৈরি করেছেন, যা ওয়ার্মহোলের সমীকরণে বর্ণিত আচরণকে অনুকরণ করে। অর্থাৎ, বাস্তব মহাবিশ্বে সুড়ঙ্গ তৈরি না হলেও তার পেছনের পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলোকে পরীক্ষায় আনা গেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষুদ্র তথ্য একক হল কিউবিট। প্রচলিত কম্পিউটারের বিট শুধু ০ বা ১, কিন্তু কিউবিট একই সঙ্গে একাধিক অবস্থা ধারণ করতে পারে। এই অদ্ভুত ক্ষমতার জন্যই কোয়ান্টাম কম্পিউটার জটিল পদার্থবিজ্ঞানের মডেল তৈরি করতে পারে। গবেষকেরা এই কিউবিটগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এমন একটি ব্যবস্থা বানান, যা দেখতে দুটি আলাদা বিন্দুর মতো। অথচ গাণিতিকভাবে তারা যেন অদৃশ্যভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এই অবস্থায় বিজ্ঞানীরা এক পাশে তথ্য পাঠান। আশ্চর্যের বিষয়, সেই তথ্য অপর পাশেও এমনভাবে হাজির হয়, যেন তা কোনো অদৃশ্য সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে ভ্রমণ করেছে। এই আচরণটি ঠিক সেই ধরনের সমীকরণের সঙ্গে মিলে যায়, যেগুলো ওয়ার্মহোলের তাত্ত্বিক বর্ণনা দেয়। ফলে, ওয়ার্মহোলের গণিত বাস্তব সিস্টেমে কেমনভাবে কাজ করতে পারে, তা দেখা সম্ভব হয়। এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বড় একটি কারণে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুই মহাশক্তিশালী তত্ত্ব মহাকর্ষ তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। বৃহৎ স্কেলে মহাবিশ্বের গঠন ব্যাখ্যা করে মহাকর্ষ, আর ক্ষুদ্রতম কণার আচরণ বোঝায় কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কিন্তু এই দুই জগতের ভাষা আলাদা। ওয়ার্মহোলের মতো ধারণা এই দুই তত্ত্বের মাঝখানে এক অদ্ভুত সেতু তৈরি করে। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এমন সিমুলেশন তৈরি করা মানে বিজ্ঞানীরা এখন সেই সেতুর উপর দাঁড়িয়ে পরীক্ষায় দেখতে পারছেন, ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম কণার আচরণ থেকে কীভাবে স্থান ও সময়ের মতো বৃহৎ কাঠামো জন্ম নিতে পারে। অবশ্য এই গবেষণা দেখে এখনই কেউ যেন কল্পনা না করেন যে ভবিষ্যতে মানুষ ওয়ার্মহোল দিয়ে মহাকাশ ভ্রমণ করবে। এই সিমুলেশন মোটেই বাস্তব মহাজাগতিক সুড়ঙ্গ নয়। এটি শুধু একটি গাণিতিক মডেল, কোয়ান্টাম যন্ত্রে যার অনুকরণ করা হয়েছে। তবু এর গুরুত্বও কম নয়। কারণ এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার শুধু দ্রুত গণনা করার যন্ত্র নয়, এটি মহাবিশ্বের গভীর পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষাগারও হতে পারে। প্রতিটি নতুন সিমুলেশন আমাদের মহাবিশ্বের অদৃশ্য নিয়মগুলোকে একটু একটু করে উন্মোচন করছে। ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে দেশ-কালের বিশাল কাঠামো- সবকিছুর পেছনে কী ধরনের মৌলিক নিয়ম কাজ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আধুনিক বিজ্ঞান। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের এই ক্ষুদ্র “কৃত্রিম ওয়ার্মহোল’’ তাই শুধু প্রযুক্তি কৌতূহলের ব্যাপার নয়। এ আসলে বাস্তবতার গভীরে তাকানোর নতুন জানালা।

 

সূত্রঃ Trendora

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + sixteen =