এক শতাব্দী আগে টমাস আলভা এডিসন যে প্রযুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটাই হয়তো এখন নতুন করে শক্তির মানচিত্র বদলাতে চলেছে। তিনি এক সময় নিকেল–আয়রন ব্যাটারিকে গাড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎ ভাবতেন। আজ তা সত্যিই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর শক্তি অবকাঠামোর জন্য বেশি মানানসই হয়ে উঠেছে। ক্যার্লিফনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের -এর প্রকৌশলীরা এমন এক প্রোটোটাইপ ব্যাটারি বানিয়েছেন, যা সেকেন্ডের মধ্যে চার্জ হয় এবং ১২,০০০ বারের বেশি চার্জ-ডিসচার্জ সামলাতে পারে। প্রতিদিন ব্যবহার করলেও তা প্রায় ৩০ বছরের সমান আয়ু নিয়ে টিকে থাকতে পারে। রিচার্জেবল বিদ্যুৎ নতুন কিছু নয়। ১৯০০ সালের আশেপাশে আমেরিকার রাস্তায় গ্যাসচালিত গাড়ির চেয়ে আধা-ইলেকট্রিক গাড়িই চলত বেশি। ১৯০১ সালে এডিসন লেড-অ্যাসিড অটোমোটিভ ব্যাটারির পেটেন্ট নেন। তখনই ইতিহাস অন্যরকমও হতে পারত। কিন্তু এই গাড়িগুলির দাম ছিল বেশি আর পাল্লা ছিল ৩০ মাইল। এই সীমাবদ্ধতার কারণে এডিসনের স্বপ্নের নিকেল–আয়রন ব্যাটারি তখন পূর্ণতা পায়নি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি আলাদা। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবেশবিধ্বংসী প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে নবায়নযোগ্য শক্তি এখন বাস্তব ও জরুরি বিকল্প। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বাজার দখল করে আছে ঠিকই কিন্তু এডিসনের নিকেল–আয়রন ব্যাটারির ধারণাটা হারিয়ে যায়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকেরা বলছেন, গাড়ির জন্য না হলেও, সৌর ফার্মের মতো স্থির অবকাঠামোয় এর সম্ভাবনা বিপুল। এই ব্যাটারির ভিত গড়া হয়েছে ন্যানোস্কেল রাসায়নিক বন্ধনে। শুনতে জটিল, কিন্তু নীতিটা আশ্চর্যভাবে সরল। গবেষক মাহের এল-কাদি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, আধুনিক ন্যানোটেকনোলজি মানেই জটিল যন্ত্র নয়। কখনও কখনও সহজ উপাদান আর উপযুক্ত কৌশলেই কাজ হয়। দলটি অনুপ্রেরণা পেয়েছে দুটি উৎস থেকে- মৌলিক রসায়ন এবং কঙ্কালতন্ত্র। মানুষের হাড় তৈরি হয় নির্দিষ্ট প্রোটিন কাঠামোর ওপর ক্যালসিয়াম-ভিত্তিক খনিজ বসিয়ে। এক্ষেত্রে উপাদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বসানোর পদ্ধতিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রোটিন নির্দেশ দেয়, খনিজ ঠিক কোথায়, কীভাবে বসবে। ফলে গড়ে ওঠে শক্ত কিন্তু নমনীয় গঠন। এই ধারণাটিকেই কাজে লাগিয়ে গবেষকরা ক্যালসিয়ামের বদলে ব্যবহার করেন নিকেল ও আয়রন। প্রোটিন হিসেবে নেন গরুর মাংস প্রক্রিয়াকরণের অবশিষ্ট উপপণ্য। সেটিকে মেশানো হয় গ্রাফিন অক্সাইডের কার্বন-অক্সিজেনের এক-পরমাণু-ঘন পাতলা স্তরের সঙ্গে। তাতে ভাঁজ করা প্রোটিন কাঠামোর মধ্যে গজিয়ে ওঠে অতি ক্ষুদ্র পুঞ্জ বা ন্যানোক্লাস্টার। তার একদিকে পজিটিভ ইলেকট্রোড তড়িৎদ্বার, অন্যদিকে নেগেটিভ চার্জযুক্ত আয়রন তড়িৎদ্বার। এই পুঞ্জটির প্রস্থ পাঁচ ন্যানোমিটারেরও কম। মানুষের একটি চুলের সমান প্রস্থ পেতে লাগবে ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ এমন পুঞ্জ। গ্রাফিন অক্সাইডে অক্সিজেন সাধারণত অন্তরক বা ইনসুলেটরের মতো কাজ করে—যা ব্যাটারির জন্য এক বাধা। এর সমাধান হল তাকে অতিতপ্ত জলে উত্তপ্ত করা। সেই উচ্চ তাপে প্রোটিন কার্বনে রূপান্তরিত হয়, অক্সিজেন বেরিয়ে যায়, আর ধাতব পুঞ্জটি আরও গভীরে স্থিত হয় কাঠামোর মধ্যে। শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় এক অ্যারোজেল, যার আয়তনের প্রায় ৯৯ শতাংশই বাতাস। এখানেই খেলে যায় পৃষ্ঠতলের জাদু। কণা যত ছোট, পৃষ্ঠতল তত বেশি। আর পৃষ্ঠতল যত বেশি, তত বেশি পরমাণু বিক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। ফলে চার্জ-ডিসচার্জ হয় অনেক দ্রুত, বেশি চার্জ সঞ্চিত হয়, দক্ষতাও বাড়ে বহুগুণ। এখনও অবশ্য এই নিকেল–আয়রন অ্যারোজেল ব্যাটারির শক্তি-সংরক্ষণ ক্ষমতা লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কাছাকাছি নয়। তাই বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এটি উপযুক্ত নয়। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দ্রুত সঞ্চয় করে রাতে গ্রিডে পাঠানো – এই কাজে এটি আদর্শ হতে পারে। এমনকি উচ্চ বিদ্যুৎ-ব্যয়ী ডেটা সেন্টারের ব্যাকআপ শক্তি হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য। সবচেয়ে বড় কথা, এটি বিরল ধাতুর ওপর নির্ভরশীল নয়। লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির এটাই বড় সীমাবদ্ধতা। নিকেল–আয়রন প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত উপাদান সহজলভ্য, প্রক্রিয়াটিও তুলনামূলকভাবে মৃদু তাপ প্রয়োগেই সম্পন্ন হয়। এক শতাব্দী আগে যে ধারণা সময়ের কাছে হেরে গিয়েছিল, আজ সেটাই নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরে আসছে। গাড়ির ইঞ্জিন বদলাতে না পারলেও, তা হয়তো বদলে দেবে শক্তি অবকাঠামোর চেহারা। এডিসনের অসমাপ্ত অধ্যায় আবারও খোলা হচ্ছে।
সূত্র : Popular Science; February 2026.
