পাখিরা শুধু উড়তে জানে তা নয়, কথা বলতে আর শুনতেও ওস্তাদ। ডাক, সুর, সতর্কবার্তা, প্রেমের গান এ সবকিছুই তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ । সঙ্গী ডাকার জন্য, শিকারির উপস্থিতি জানান দিতে, কিংবা ছানাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, পাখিরা শব্দের উপর নির্ভর করে। শব্দই তাদের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। তাই অতিরিক্ত কৃত্রিম শব্দ বা শব্দদূষণ তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা আলাদা গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের তৈরি শব্দ, যেমন- গাড়ির হর্ন, ট্রাফিকের গর্জন, নির্মাণকাজের আওয়াজ, পাখিদের আচরণ ও শারীরিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৃহৎ সমীক্ষা-গবেষণা এই প্রভাবের এক বিশ্বব্যাপী চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণাটি করেছেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক স্টেট ইউনিভার্সিটি-র গবেষকেরা। তারা ছয়টি মহাদেশ জুড়ে ১৬০ প্রজাতির পাখি নিয়ে পরিচালিত ১৫০টিরও বেশি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। প্রধান গবেষক, সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী ন্যাটালি ম্যাডেন জানান, এই ব্যাপক-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা বিচ্ছিন্ন গবেষণার ফলাফল একত্র করে একটি সামগ্রিক প্রবণতা বোঝার সুযোগ পেয়েছেন । গবেষকেরা খতিয়ে দেখেছেন, মানুষের তৈরি শব্দ পাখিদের আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন আনে । তারা কতটা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, কীভাবে খাবার সংগ্রহ করে, কীভাবে যোগাযোগ করে, ঝুঁকি নেয় কি না, বা বাসস্থানের ব্যবহার বদলায় ইত্যাদি। পাশাপাশি, তাদের শারীরিক বৃদ্ধির হার, হরমোনের পরিবর্তন এবং প্রজনন সাফল্যের মতো ‘পটুতা’ সূচকও বিবেচনা করা হয়েছে । সমগ্র বিশ্লেষণে একটি স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠেছে- মানুষের তৈরি শব্দ পাখিদের আচরণ ও শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থাতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ট্রাফিক, নির্মাণকাজ বা শিল্পকারখানার আওয়াজ, সব ধরনের শব্দই কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবনে বিঘ্ন ঘটায়। তবে সব পাখি একরকম প্রতিক্রিয়া জানায় না। তাদের জীবনচক্র বা ‘লাইফ হিস্ট্রি’ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। যেমন, গাছের কোটরে বাসা বাঁধা পাখিদের শব্দদূষণের কারণে তাদের ছানাদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় । অন্যদিকে উন্মুক্ত বাসা ব্যবহারকারী পাখিদের মধ্যে এই প্রভাব তুলনামূলক কম। শহুরে পাখিদের শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। আবার গ্রাম বা প্রাকৃতিক নিরিবিলি পরিবেশে থাকা পাখিদের ক্ষেত্রে এই হরমোনের মাত্রা তুলনায় কম। অর্থাৎ শহরের অবিরাম শব্দ তাদের শরীরকে প্রায় স্থায়ী চাপের মধ্যে রাখে । প্রায় সব ধরনের মানবসৃষ্ট শব্দই পাখিদের প্রজনন সাফল্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কম ডিম পাড়া, ডিম ফোটার হার কমে যাওয়া, ছানাদের বেঁচে থাকার হার হ্রাস পাওয়া, এসবই শব্দদূষণের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ফলাফল শুধু পাখিদের আচরণগত পরিবর্তনের কাহিনী নয়, এটি জৈববৈচিত্র্য সংকটের সঙ্গেও জড়িত। যখন কোনো প্রজাতির প্রজনন হার কমে যায় বা দীর্ঘমেয়াদে চাপ বাড়ে, তখন তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনাও কমে আসে। গবেষকেরা বলছেন, শব্দদূষণকে আমরা প্রায়ই অদৃশ্য সমস্যা বলে এড়িয়ে যাই, কারণ এটি ধোঁয়া বা প্লাস্টিকের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু এর প্রভাব নীরব, গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। গবেষক কার্টার মনে করিয়ে দেন, জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মতো বড় সমস্যাগুলো আমাদের কাছে প্রায়ই অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়। কিন্তু শব্দ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমাদের হাতে বাস্তবসম্মত সমাধান আছে। উন্নত শব্দরোধী উপকরণ ব্যবহার, নগর পরিকল্পনায় ‘শান্ত অঞ্চল’ তৈরি, সড়ক ও নির্মাণ প্রকল্পে শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি প্রয়োগ এসবই কার্যকর হতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের জানা আছে, দরকার সচেতনতা এবং সদিচ্ছা।
সূত্র: Nautilus, Feb, 2026
