সমুদ্রের এমন এক স্তর আছে, যেখানে আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে পৃথিবী যেন থমকে থাকে। না পুরো দিন, না সম্পূর্ণ রাত। এই অর্ধ অন্ধকার অঞ্চলের নাম হল “গোধূলি অঞ্চল “। গভীর সমুদ্রের সেই রহস্যময় অঞ্চলের মাছের লার্ভা এবার চমকে দিল দৃষ্টিবিজ্ঞানের জগৎকে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ১৫০ বছরের পুরোনো পাঠ্যপুস্তকের ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাঁরা এমন এক নতুন “হাইব্রিড” বা দ্বৈত গুণসম্পন্ন আলোক-সংবেদী গ্রাহী কোষ (ফোটোরিসেপ্টর) শনাক্ত করেছেন, যা ‘রড’ ও ‘কোন’—এই দুই পরিচিত কোষের বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ।
এতদিন ধরে পাঠ্যপুস্তকে আমরা পড়তাম—মেরুদণ্ডী প্রাণীর চোখে দুটি প্রধান আলোক সংবেদী কোষ থাকে: উজ্জ্বল আলোয় কাজ করা ‘কোন’ কোষ এবং অন্ধকারে সক্রিয় ‘রড’ কোষ। কিন্তু প্রকৃতি কখনও কখনও এত সরল নিয়ম মানে না। সে যেন গোপনে তৈরি করে রেখেছিল তৃতীয় এক সমাধান। প্রধান গবেষক ড. ফাবিও কোর্তেসি ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছেন, গভীর সমুদ্রের মাছের লার্ভার চোখে এমন এক “সংকর”কোষ রয়েছে, যার গঠন ‘রড’ কোষের মতো, অথচ তার জিনগত ও আণবিক বৈশিষ্ট্যে ‘কোন’ কোষের ছাপ স্পষ্ট। একেবারে প্রকৃতি নিজেই দুটি ভিন্ন ব্যবস্থার সেরা অংশগুলো জুড়ে তৈরি করেছে আধো-আলোয় দেখার জন্য বিশেষভাবে দক্ষ এক দৃষ্টিযন্ত্র।
গবেষকেরা লোহিত সাগরের ২০ থেকে ২০০ মিটার গভীরতা থেকে সংগৃহীত অতি ক্ষুদ্র লার্ভার রেটিনা বিশ্লেষণ করেন। মাত্র অর্ধ সেন্টিমিটার লম্বা প্রাণী, চোখ এক মিলিমিটারেরও কম। কিন্তু তারই মধ্যে লুকিয়ে ছিল বিবর্তনের এক অভিনব কৌশল। কারণ, এই মাছেরা জীবনের শুরুতে তুলনামূলক উজ্জ্বল পৃষ্ঠজলে বেড়ে ওঠে,তারপর প্রাপ্তবয়স্ক হলে এক কিলোমিটার গভীর অন্ধকার জগতে নেমে যায়। এই আলোক-পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেই তাদের চোখ গড়ে তুলেছে এক মধ্যবর্তী, নমনীয় ব্যবস্থা—যা না পুরো দিন, না পুরো রাত—বরং দুয়ের মাঝের পৃথিবীর জন্য তৈরি।
এই আবিষ্কারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাই কেবলই এটি জীববিজ্ঞানের পাঠ্য বইয়ে নতুন করে লেখার বিষয় হয়ে থাকবে না। এটি প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানেও খুলে দিতে পারে নতুন দিগন্ত। স্বল্প-আলোতে আরও কার্যকর ক্যামেরা, রাতে উন্নত দৃষ্টি সহায়ক যন্ত্র কৌশল—এমনকি গ্লকোমা প্রভৃতি চোখের রোগ বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণা অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। প্রকৃতি যে সমস্যার সমাধান লক্ষ লক্ষ বছর আগে করে ফেলেছে, বিজ্ঞান এখন তার নকশা পড়তে শিখছে মাত্র।
আবারও প্রমাণিত হল যে প্রকৃতি বিস্ময়ে ভরা। বিবর্তন কেবল নিয়ম মানে না, প্রয়োজনে নিয়ম ভেঙেও নতুন পথ তৈরি করে। অন্ধকার মানেই শূন্যতা নয় – সেই অন্ধকারের বুকেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকরেখা। যা একদিন বদলে দিতে পারে আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই।
সূত্র: “Deep-sea fish reveal an alternative developmental trajectory for vertebrate vision” by Lily G. Fogg, Stamatina Isari, et.al; 11th February 2026, published in Science Advances.
DOI: 10.1126/sciadv.adx2596
