সংখ্যার নানা রূপ

সংখ্যার নানা রূপ

আশীষ লাহিড়ী
Posted on ১৭ জানুয়ারী, ২০২৫

‘সংখ্যা” ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। সংখ্যার সাহায্যে আমরা জিনিস গুণি, কিন্তু সংখ্যা নিজে কোনো জিনিস নয়। আপনি পরপর তিন গোল দিয়ে হ্যাট-ট্রিক করতে পারেন, কিন্তু “তিন” সংখ্যাটিকে কখনো দেখতে কিংবা ছুঁতে পারবেন না। ওটা একটা বিমূর্ত জিনিস, একটা ভাব যা থাকে আমাদের মাথার মধ্যে। নিজগুণে ওর কোনো অস্তিত্ব নেই।
পৃথিবীর সব প্রাচীন কৃষ্টিতেই দুভাবে সংখ্যাকে প্রকাশ করা হত। প্রথমটা হল “সংখ্যা-শব্দ”, যা স্থানীয় ভাষায় লেখা কিংবা উচ্চারণ করা যায়। ১০০ বোঝাতে সংস্কৃত-ভাষী কোনো লোক বলবে শতম্‌ ; আরবি-ভাষী বলবে মিয়া, গ্রীকভাষী বলবে হেকাটন।
অন্য ধারাটা হল প্রতীক ব্যবহার। চিহ্নগুলোও আবার দুরকম হতে পারে। প্রথম রকমটি হল সংখ্যার প্রতিনিধিত্বসূচক দাগ বা চিহ্ন। ১, ২, ৩ … ৯ এবং ০ এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এইসব দাগগুলোও আবার এক এক কৃষ্টিতে এক এক রকম ছিল। গ্রীকরা তাদের ১০০-র প্রতীকচিহ্ন হেকাটন লিখতে ব্যবহার করত ρ (রো)। ভারতে সবচেয়ে পুরোনো যেসব সংখ্যাচিহ্ন পাওয়া গেছে সেগুলি খরোষ্ঠী অথবা ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা, প্রায় ২৪০০ বছর আগে সেগুলি রচিত।
দ্বিতীয় রকম প্রতীকচিহ্নগুলি হল কতকগুলো নামশব্দ। মধ্যযুগের সংস্কৃত গণিতশাস্ত্রে এগুলিকে ভূত-সংখ্যা বলা হত। এই পদ্ধতিটিকে ইংরেজিতে “অবজেক্ট নাম্বার” কিংবা “ কংক্রিট নাম্বার”-ও বলা হয়। এই পদ্ধতিতে একটা সংখ্যাকে এমন একটা কোনো বস্তুর নাম দেওয়া হয় যার সঙ্গে ওই সংখ্যাটির বাস্তব কিংবা কাল্পনিক সম্পর্ক রয়েছে। যেমন চক্ষু। স্বাভাবিক অবস্থায় সবারই দুটো চোখ থাকে। তাই সংস্কৃতে “চক্ষু” শব্দটির একটা অর্থই হল ২। এই প্রতীকগুলি আবার ধর্মশাস্ত্র অথবা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান থেকেও নেওয়া হত। যেমন, “অগ্নি” শব্দটি ৩-এর প্রতিনিধি, যেহেতু হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী যজ্ঞাগ্নির সংখ্যা তিন। একই কারণে “অঙ্গ” শব্দটি ৬-এর প্রতিনিধি, যেহেতু বেদের ছয়টি অঙ্গ আছে (বেদাঙ্গ)। ছোটোবেলায় পড়তাম ১-এ চন্দ্র (একই চাঁদ), ২-এ পক্ষ (কৃষ্ণ, শুক্ল দুই পক্ষ), ৩-এ নেত্র ( শিবঠাকুরের ত্রিনয়ন) …। সে-ও সংখ্যার প্রতীকী ভাবরূপ।
এখন অবশ্য সবই অচল। আজ দুনিয়া শুদ্ধু লোক হিন্দু-আরবি সংখ্যা-প্রতীকগুলোকেই মেনে নিয়েছে: 1,2,3 …। স্থানীয় ভাষায় সংখ্যা-শব্দগুলোর উচ্চারণ কিন্তু আজও আলাদা। বাংলায় এক, দুই, তিন; গ্রীকে এনা, দুও, ত্রিয়া; ফরাসিতে আঁ, দ্যু, ত্রোয়া।
(তথ্য-উৎস, Meera Nanda, Science in Saffron, Three Essays Collective, Gurgaon, 2016)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − ten =