সকলেই সমান দীর্ঘায়ু? 

সকলেই সমান দীর্ঘায়ু? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ এপ্রিল, ২০২৬

আমদের সকলেরই একটা সাধারণ চাহিদা, ইসস আয়ুটা যদি আর কদিন বাড়ত, আর যদি একটা বছর বেশি বাঁচতাম এটা করে যেতাম বা ওটা করে যেতাম। মানুষের আয়ু বাড়ানোর লক্ষ্যে আজকের বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনেক দূর এগিয়েছে। তবে শুধুমাত্র দীর্ঘ জীবন নয়,বিজ্ঞানীরা চান, মানুষ যেন সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাঁচতে পারে এবং মৃত্যুর সময়কাল যেন সবার জন্য প্রায় একই হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা মারফৎ দেখা গেছে দীর্ঘ জীবন পাওয়ার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। বরং, আয়ুষ্কাল বাড়ানোর চিকিৎসাগুলো অনেক সময় এমন এক বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে ফলাফল নির্ভর করছে ব্যক্তিগত জীবনের সম্ভাব্যতার ওপর। অনেকটা লটারির মতো।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তারা বিভিন্ন প্রাণীর ওপর পরিচালিত বহু গবেষণার ফল পুনর্মূল্যায়ন করে দেখেছেন, যে পদ্ধতিগুলোকে আমরা দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি বলে ভাবি, সেগুলো আদতে সবার ক্ষেত্রে কতটা সমানভাবে কাজ করে।

এই গবেষণায় তাঁরা তিনটি বহুল আলোচিত আয়ু-বর্ধক পদ্ধতির উপর আলোকপাত করেছেন। যথা- খাদ্যাভ্যাস সংযম, র‍্যাপামাইসিন, এবং মেটফর্মিন। প্রথমটি, ক্যালোরি কমিয়ে পুষ্টি বজায় রাখে। বহু বছর ধরেই এটি আয়ু বৃদ্ধির একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত। এটি কোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা mTORC1—কে ধীর করে, যা বার্ধক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অন্যদিকে, র‍্যাপামাইসিন সরাসরি এই mTORC1-কে বাধা দেয়, আর মেটফর্মিন (যা ডায়াবেটিসের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত ) কোষের শক্তি ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন করে পরোক্ষভাবে একই পথকে প্রভাবিত করে।

আপাতদৃষ্টিতে এই সব পদ্ধতিই গড় আয়ু বাড়ায় ঠিকই। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে মূল দ্বন্দ্ব। গবেষণায় দেখা গেছে, আয়ু বাড়লেও মৃত্যুর বয়সের মধ্যে বৈচিত্র্য বেড়ে যায় প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থাৎ, কেউ এই চিকিৎসা থেকে অসাধারণ উপকার পায়, আবার কেউ খুব সামান্য। ফলে, দীর্ঘ জীবন পাওয়া একটি নিশ্চিত ফল নয়, বরং এক অনিশ্চিত সম্ভাবনা।

এই বৈপরীত্য আমাদের দীর্ঘদিনের একটি আদর্শ আয়ুষ্কালের রেখচিত্র সম্পর্কিত ধারণাকে বদলে দেয়। ধারণাটি ছিল, উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষ একই বয়সের কাছাকাছি সময়ে মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না। জীবনে বেশিদিন টিকে থাকার প্রচেষ্টা মৃত্যুর সময়কে সংকুচিত না করে বরং আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বৈষম্যর কারণও জটিল। জিন বৈচিত্র্য, ওষুধের ডোজ, পরিবেশগত প্রভাব—সব মিলিয়ে প্রতিটি শরীর এইসব চিকিৎসার প্রতি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে একই চিকিৎসা একেকজনের জন্য একেক রকম ফল দেয়।

গবেষক তাহ্লিয়া ফুলটন যথার্থই বলেছেন, “এই পদ্ধতিগুলো আয়ুষ্কাল বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে না। তাই ফলাফল অনেকটা লটারির মতো মনে হয়।‘’কার যে কতটা কাজ করবে সেটা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।

এই গবেষণা থেকে আমরা প্রমাণ পেলাম দীর্ঘায়ু শুধুমাত্র সংখ্যার খেলা নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক পদ্ধতি গড়ে তোলা, যা শুধু জীবনের দৈর্ঘ্য বাড়ায় না, বরং সেই বাড়তি সময়টুকু সবার জন্য সমানভাবে স্বাস্থ্যকর ও নিশ্চিত করে। নইলে, দীর্ঘ জীবন একটি বৈজ্ঞানিক অর্জন হলেও, তা ন্যায়সঙ্গত মানবিক সাফল্যে পরিণত হবে না।

 

সূত্র: “No evidence for squaring the survival curve: lifespan-extending treatments increase variation in age- at-death” by Tahlia L. Fulton, Erin L. Macartney and Alistair M. Senior, 1st February 2026, published in Biology Letters.

DOI: 10.1098/rsbl.2025.0651

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × one =