সাগরতলের গুপ্তধন: আশা ও আশঙ্কা 

সাগরতলের গুপ্তধন: আশা ও আশঙ্কা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিশ্বজুড়ে ‘সবুজ উত্তরণ’-এর গতি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে এক শ্রেণির ধাতুর চাহিদা। যেমন, নিকেল, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, কপার। এইসব ‘অপরিহারয ধাতু’ ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রভৃতি প্রযুক্তিতে কাজে লাগে। তাই এগুলিই এখন ভূরাজনীতির নতুন মুদ্রা। স্থলভাগে এদের মজুত সীমিত। উৎপাদন এবং খননে পরিবেশগত ক্ষতিও প্রবল। ফলে এবার নজর ঘুরেছে সমুদ্রের তলায়। প্রায় চার কিলোমিটার গভীরে, যেখানে আলো পৌঁছয় না, আর জীবন চলে চরম অনটনে। এই প্রেক্ষাপটে এক আন্তর্জাতিক গবেষণা নতুন করে আলো ফেলেছে গভীর সমুদ্র খননের সম্ভাবনা ও বিপদের উপর। গবেষণাটি জানাচ্ছে, ভয় যতটা ছিল, সামগ্রিক পরিবেশগত ক্ষতি হয়তো ততটা ব্যাপক নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ক্ষতি নেই। বরং খননযন্ত্র যেখানে গেছে, সেখানেই স্থানীয় জীববৈচিত্র্য কার্যত ভেঙে পড়েছে। খননের সরাসরি প্রভাবাধীন এলাকায় প্রাণীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। আর প্রজাতিগত বৈচিত্র্য নেমে গেছে ৩২ শতাংশ-তে। অর্থাৎ, সমুদ্রতলের উপর দিয়ে চলা যন্ত্রের চাকা জীবনের একটা বড় অংশ মুছে দিচ্ছে নীরবে। কিন্তু এই গবেষণা করতে গিয়েই, বিজ্ঞানীরা প্রায় ৪,০০০ মিটার গভীরে খুঁজে পেয়েছেন শত শত এমন প্রজাতি, যাদের অস্তিত্ব আগে জানা ছিল না। গভীর সমুদ্র এখনও আমাদের কাছে প্রায় অচেনা এক গ্রহের মতো। এ যেন পৃথিবীর ভিতরেই আরেক পৃথিবী। প্রশান্ত মহাসাগরের ক্লারিয়ন–ক্লিপারটন অঞ্চলে (মেক্সিকো আর হাওয়াইয়ের মাঝামাঝি) পাঁচ বছর ধরে চলা এই প্রকল্পে একাধিক দেশের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা অংশ নেন। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কম-অন্বেষিত অঞ্চলগুলোর একটি। অথচ এখানেই রয়েছে বিপুল পরিমাণ ধাতব নডিউল, যা কিনা খনন সংস্থাগুলোর চোখের মণি। গটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী টমাস ডালগ্রেন বলছেন, “সবুজ উত্তরণের জন্য এই ধাতুগুলো দরকার, কিন্তু অপ্রতুল। অথচ গভীর সমুদ্রের তলায় এগুলি বিপুল পরিমাণে মজুত রয়েছে। সমস্যা হল, আমরা এখনও পুরোপুরি জানিই না, এগুলো তুলে আনলে পরিবেশে কী ঘটবে।“ আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত নিয়ম নির্দেশ মেনে এই গবেষণা চালানো হয়েছে। পাঁচ বছরে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রে কাটিয়েছেন মোট ১৬০ দিন। এই সময়ে তাঁরা জীববৈচিত্র্যের তালিকা বানানোর পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে খননের প্রভাবও বিশ্লেষণ করেছেন। এই গভীরতায় জীবন যে কতটা ধীর, তা বোঝাতে একটা তুলনাই যথেষ্ট। উত্তর সাগরের তলদেশ থেকে নেওয়া একটিমাত্র নমুনায় যেখানে ২০,০০০ পর্যন্ত প্রাণী পাওয়া যায়, সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর তলদেশে একই আকারের নমুনায় প্রাণীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ২০০ ! আশ্চর্যের বিষয়, প্রজাতির সংখ্যা কিন্তু প্রায় সমান। অর্থাৎ, জীবন আছে, কিন্তু তা ছড়ানো, বিরল, এবং ভীষণভাবে সংবেদনশীল। গবেষকেরা ০.৩ মিলিমিটারের চেয়ে বড় আকারের ৪,৩৫০টি প্রাণী সংগ্রহ করেছেন, যাদের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ৭৮৮টি প্রজাতি। এর বেশিরভাগই ব্রিসল ওয়ার্ম, ক্রাস্টেশিয়ান, শামুক ও ঝিনুকজাতীয় মোলাস্ক। এমনকি একটি সম্পূর্ণ নতুন একক প্রবাল প্রজাতিও শনাক্ত হয়েছে, যা আলাদা গবেষণায় বর্ণনা করা হয়েছে। ডালগ্রেন বলছেন, “এই অঞ্চলে আমি ১৩ বছরের বেশি সময় কাজ করেছি, কিন্তু এত বড় গবেষণা আগে হয়নি। অধিকাংশ প্রজাতিই বিজ্ঞানের কাছে নতুন। তাই ডিএনএ-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ছাড়া এই জীববৈচিত্র্য বোঝাই যেত না।“গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বদলায়, সম্ভবত সমুদ্রতলে খাবার পৌঁছনোর তারতম্যের কারণে। কিন্তু বড় প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রজাতিগুলো কতটা বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে? নাকি এরা খুব সীমিত অঞ্চলের বাসিন্দা? লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিজ্ঞানী এড্রিয়ান গ্লোভার সতর্ক করে দিচ্ছেন, “খননের ফলে জীববৈচিত্র্য হারানোর ঝুঁকি কতটা, সেটা বুঝতে হলে আমাদের ক্লারিয়ন–ক্লিপারটন অঞ্চলের সেই ৩০ শতাংশ সংরক্ষিত এলাকায় কী আছে, তা জানতে হবে। সত্যি বলতে, সেখানে কী বাস করে, সে বিষয়ে আমাদের প্রায় কোনো ধারণাই নেই।“ গভীর সমুদ্রে খনন তাই আজ এক দ্বিধার মুখে। একদিকে সবুজ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় ধাতু, অন্যদিকে এমন এক জীবজগৎ, যাকে আমরা এখনও চিনি না, বুঝি না। প্রশ্ন নৈতিকতারও। অন্ধকারের নীচে লুকিয়ে থাকা এই প্রাণগুলোর মূল্য আমরা কতটা দিতে প্রস্তুত?

 

সূত্র: Nature Ecology & Evolution. Note: Content may be edited for style and length.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + 2 =