সাগরের জঞ্জাল সাফাই

সাগরের জঞ্জাল সাফাই

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ এপ্রিল, ২০২৫

বাতাস ও পৃথিবীর ঘূর্ণন সমুদ্রকে সদা প্রবাহমান রাখে। এই প্রবাহমানতাই সমদ্রে ভাসমান প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়। এই ঘটনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল প্রশান্ত মহাসাগরের মহা আবর্জনা কুন্ড, যার পোশাকি নাম ‘দ্য গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’। সমদ্রে দুই ধরনের প্রবাহ কাজ করে- প্রথমটি মাধ্যাকর্ষণ ও পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে ঘটে। অপরটি হল একম্যান প্রবাহ, যা বাতাসের দ্বারা তাড়িত হয়। উভয় প্রবাহই আবর্জনাকে সমুদ্রের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়। আর যখন এই প্রবাহগুলি ঘূর্ণির মতো পাক খেতে থাকে, তখন তারা আবর্জনা টেনে নিয়ে যায় পৃথিবীর পাঁচটি উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কেন্দ্রে। সময়ের সাথে সাথে, এসব জায়গা প্লাস্টিক সহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার আস্তাকুড় হয়ে ওঠে। বৃহত্তর প্রশান্তের আবর্জনা অঞ্চল, উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বলয়ে সবচেয়ে কুখ্যাত। এটি সমুদ্রের সবচেয়ে বড় আবর্জনা কুন্ড। গবেষণার বিষয়ও বটে! অনেক প্রকল্প এখানে শুরু হয়েছে এই অঞ্চল সাফাইয়ের উদ্যোগে। এটি প্লাস্টিকের আবর্জনা, মাছ ধরার পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতির ও অন্যান্য আবর্জনার বিশাল কুন্ড। প্লাস্টিক ভাঙতে শত শত বছর সময় লাগে। আর যখন ভাঙে, তখন তা ছোট ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয় যা সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে। এই আবর্জনার খাবারে ঢুকে সামুদ্রিক জীব, পাখি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মস্ত ঝুঁকির কারণ। এই কুন্ডটিকে নিছক একটি বিশালকার আবর্জনার দ্বীপ মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আসলে একটি বিশাল এলাকা যেখানে আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এটি সাফ করা কঠিন, কারণ আবর্জনায় মিশে থাকে ছোট ছোট প্লাস্টিকের টুকরা। বিজ্ঞানীরা এখন সাফাইয়ের কাজে সমুদ্রের নিজস্ব প্রবাহকেই কাজে লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। নতুন গবেষণায় এমন জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে জলই আবর্জনাকে একত্রিত করে। সে কেমন ? “জ্বালানি পুড়িয়ে জলযান টেনে নিয়ে আবর্জনা তোলার চেয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে জাল পাতলে, সমুদ্র-স্রোতই আবর্জনাকে একত্রিত করবে ” বলেছেন রদ্রিগো ডুরান। গবেষকরা কুড়ি বছরের বেশিসময় ধরে স্যাটেলাইট ও ড্রিফটার ডেটা ব্যবহার করে ভাসমান আবর্জনার জন্য উচ্চ চলাচল এলাকা চিহ্নিত করেছেন। এই এলাকাগুলিকে অস্থায়ী আকর্ষণের সমাহার বা ‘টিআরএপি’ বলা হয়। সেখানে ঘূর্ণমান প্রবাহই আবর্জনাকে একত্রিত করে। টিআরএপি তখনই তৈরি হয় যখন চারটি ঘূর্ণমান প্রবাহ যথাযথ প্যাটার্নে ঘোরে। প্রায় ৬০% সময়ে, এই প্যাটার্ন আবর্জনাকে একটি স্থায়ী অঞ্চলে টেনে নিয়ে যায়। শত শত মাইল অতিক্রম করার পরিবর্তে, কর্মীরা এখন পরিচিত টিআরএপি অবস্থানে অপেক্ষা করলেই কাজ হয়ে যায়। সঠিকভাবে অবস্থান করলে, তাঁরা জালের সাহায্যে অনায়াসেই প্রবাহের মাধ্যমে টেনে আনা আবর্জনা তুলে নিতে পারবেন। এতে জ্বালানি, সময় এবং শ্রমের সাশ্রয় হবে। এই এটিআরপি ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার, তেল ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ, অথবা আগ্নেয়গিরির ছাই ও দাবানলের ধোঁয়ার পথ অনুসরণ করার জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এটিআরপিগুলি, বেশি পরিমাণ প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। এই প্রযুক্তিটি শুধু তত্ত্বে নয়, বাস্তবে সমুদ্রের তথ্যের সাথে পরীক্ষিত। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা টিআরপি ট্র্যাকিং ব্যবহার শুরু করতে পারে। স্যাটেলাইট মনিটরিং উন্নত হবার সাথে সাথে ছোট এটিআরপি আরও সহজে ট্র্যাক করা যায়। “এ এক রোমাঞ্চকর আবিষ্কার”, ডুরান মন্তব্য করেছেন। আবর্জনার চাঙড়ের আকার বিশাল, কিন্তু কোথায় ও কখন আবর্জনা একত্রিত হয় তা জানলে কর্মীদের লড়াইয়ের সুযোগ বাড়ে বইকি !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 10 =