
প্রায় ২৫২ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জৈব বিপর্যয় ঘটেছিল, যা ‘পার্মিয়ান যুগের সমাপ্তি ‘ বা ‘পার্মিয়ান গণ বিলুপ্তি ‘ নামে পরিচিত। এই সময়ে প্রায় ৮০% সামুদ্রিক প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, যা বৈজ্ঞানিকদের কাছে “মহা মৃত্যু” হিসেবে পরিচিত। এরপর সমুদ্রের জীবন একই রকম গতিতে চলতে থাকে এবং মৃত্যুশোকের অনুরূপ “মহা নীরবতা” যুগ আরও দশ লক্ষ বছর বজায় থাকে। উষ্ণমণ্ডল থেকে মেরু অঞ্চল পর্যন্ত মহাসাগরের জীবন অদ্ভুতভাবে সমরূপ ধারণ করে। যেসব প্রজাতি একসময় সংকীর্ণ স্থানীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, আকস্মিকভাবে তাদের সর্বত্র দেখা যেতে থাকে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে একটি রহস্য হয়ে দাঁড়ায়।
স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা এই রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা জীবাশ্ম এবং পরিবেশগত তথ্য ব্যবহার করে দেখেছেন মহা মৃত্যুর পরে সমুদ্রের জীবরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। গবেষণায় সাপ, শামুক এবং শঙ্খের মতো জীবের উপর আলোকপাত করা হয়। এরা শুধু বেঁচে থাকেনি, বরং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে তাঁরা ভূ-রাসায়নিক তথ্য ব্যবহার করে প্রাচীন মহাসাগরের তাপমাত্রা এবং অক্সিজেনের মাত্রার এক মডেল তৈরি করেছেন। গবেষকরা বর্তমান সামুদ্রিক জীবদের জৈবিক তথ্যও যুক্ত করে সিমুলেট করেছেন কেন কিছু প্রাণী দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং কিছু বিলুপ্ত হয়। তথ্যগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে বিশ্বজোড়া পরিবেশগত পরিবর্তনই নির্ধারণ করে কে বেঁচে থাকবে এবং কোথায় বাস করবে। স্ট্যানফোর্ডের প্রফেসর জোনাথন পেইন বলেছেন, “আমরা এখন ব্যাপক জৈব-ভৌগোলিক পরিবর্তনগুলিকে নতুনভাবে অধ্যয়ন করতে পারছি, এবং বুঝতে পারছি কেন কিছু প্রাণী বেঁচে রইল আর কেন কিছু প্রাণী বিলুপ্ত হল।”বৈজ্ঞানিকরা প্রাচীন মহাসাগরগুলি পুনর্নির্মাণ করতে জীবাশ্ম ও রাসায়নিক চিহ্ন ব্যবহার করেন, যা তাপমাত্রা, ক্ষার এবং অক্সিজেনের পরিবর্তনের তথ্য দেয়। পার্মিয়ান যুগের শেষের দিকে সাইবেরিয়ায় বিশাল আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করেছিল এবং মহাসাগরে অম্লের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলেছিল। তবে কেবল এইসব পরিবর্তনই ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়। গবেষণা বলছে, বিলুপ্তির আগে সমুদ্রজীবন ছিল খুবই বৈচিত্র্যময়। তবে ট্রায়াসিক যুগে সমুদ্রের জীবন সব জায়গায় বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়ে। শুধু জলজ জীবনে নয়, বিশ্বজুড়েই প্রজাতির বৈচিত্র্য অর্ধেকেরও বেশি কমে যায়। প্রায় ২০০ বছর ধরে বৈজ্ঞানিকরা এই সমরূপতার কারণ নিয়ে আলোচনা করে আসছেন। শিকারি ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিলুপ্ত হওয়ার কারণে জীবিত প্রজাতিগুলো বাড়তে শুরু করে। তবে অন্য একটি ধারণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন কিছুকিছু জীবগোষ্ঠীর হিতেই কাজ করেছে, পৃথিবীকে তাদের কাছে আরও বাসযোগ্য করে তুলেছে। আজকের জীব বৈচিত্র্যের সংকট অতীতের ওই বড় বিলুপ্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই মডেলটি শুধু প্রাচীন ইতিহাসকে আলোকিত করেনি, উপরন্তু বৈজ্ঞানিকদের এখনকার বিপদগুলোও বুঝতে সাহায্য করছে। গবেষকরা বলছেন, “বর্তমান জৈব বৈচিত্র্য সংকটটি ট্রায়াসিক যুগের চেয়েও বড় মাপের বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।” গবেষণা দলটি এই মডেলটিকে অন্যান্য বড় বিলুপ্তির ঘটনার জন্য প্রয়োগ করার পরিকল্পনা করছে। আল আসওয়াদ বলেছেন, “আমাদের মডেলটি পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতি প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া অধ্যয়ন করার জন্য দুর্দান্ত।” তবে যদি আমরা এভাবে চলতে থাকি, ভবিষ্যতে মহাসাগরগুলিতে জীবদের কৌলিক সমরূপতা দেখা নিশ্চিত।