সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার জিন-ব্যাখ্যা

সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার জিন-ব্যাখ্যা

ড. শিবেশ বেরা
আণবিক জীবপদার্থবিজ্ঞানী ; সেন্ট লুইস বিশ্ববিদ্যালয় ; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
Posted on ২৩ আগষ্ট, ২০২৫

চারটে নিউক্লিওটাইড A,T,G,C ( নির্মাণের “ইট”) নিয়ে ডি এন এ বিশাল বড় একটা গলার হারের ন্যায় পলিমার বানায়। কয়েকশ মিলিয়ন নিউক্লিওটাইড দিয়ে ক্রোমোসোমের একটা ডি এন এ তৈরি হয়।
ঠিক সেইভাবে প্রোটিনও তৈরি হয় কুড়িটি মূল অ্যামিনো অ্যসিড থেকে। এই অ্যামিনো অ্যসিডগুলি একে অপরের সাথে জুড়েজুড়ে লম্বা লম্বা পলিপেপ্টাইড শৃঙ্খল তৈরি করে। সাধারণত এক একটা প্রোটিনে ১০০ থেকে ৫০০ টি অ্যামিনো অ্যাসিড অবশেষ (একসূত্রী) থাকতে পারে। তবে এর থেকে ছোট বা বড়ও হতে পারে। যেমন ইন্সুলিন প্রোটিনে ৫১টি অবশেষ রয়েছে । ডি এন এ পলিমারেজে প্রায় ১০০০টি অবশেষ থাকে। সাধারণত প্রাকৃতিক প্রোটিনের এই অ্যামিনো অ্যাসিড অবশেষ পরিবর্তিত হয়ে গেলে প্রোটিনটির আকৃতি – প্রকৃতি বদলে যায়। প্রোটিন-এর এই গঠনটাকে চারটি ধাপে ভাগ করা যায় । ১) প্রাথমিক গঠন, যেখানে অবশেষগুলোর নাম এবং ক্রম থাকে। ২) মাধ্যমিক গঠন। এটাই গঠনের মেরুদণ্ড। এগুলি আলফা হেলিক্স, বিটা বিনুনী-পাকানো চাদর কিংবা অন্য রকম কোনো (র্যা ন্ডম) গঠনের হাতে পারে। একটা প্রোটিনের মধ্যে তিন ধরনেরই গঠন থাকতে পারে, কিন্তু প্রোটিনটা যদি পুরোটাই র্যা ন্ডম কুণ্ডলী হয় তাহলে সেটা কাজ করে না। ৩) তৃতীয় পর্যায়ের গঠন। ত্রিমাত্রিক পরিসরে পেপটাইড মেরুদণ্ডর অ্যামিনো অ্যাসিড অবশেষগুলোর অভিমুখ দেখে বোঝা যায় এরা একইভাবে সজ্জিত। ৪) চতুর্থ পর্যায়ের গঠন। প্রোটিনটার মধ্যে কতগুলো পলিপেটটাইড শৃঙ্খলের উপ-একক ত্রিমাত্রিক পরিসরে একসাথে কিভাবে রয়েছে তা এ থেকে বোঝা যায়। যেমন ইনসুলিনের দুটো শৃঙ্খল। আবার হিমোগ্লোবিনের চারটি। গাঠনিক প্রোটিন কিংবা ক্রিয়াশীল প্রোটিন উভয় ক্ষেত্রেই প্রোটিনের এই সম্পূর্ণ গঠন সবসময়ই প্রয়োজন।

রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিন প্রোটিনে থাকে চারটি পলিপেপটাইড শৃঙ্খল (দুটো আলফা, দুটো বিটা)। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৭৪-টি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। এটা থাকে লাল রক্তকণিকাতে। এই হিমোগ্লোবিন-ই ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয় আর বিনিময়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিয়ে ফুসফুসকে ফেরত দেয়। সিক্‌ল সেল অ্যানিমিয়া (কাস্তে আকৃতির কোষ জনিত অ্যানিমিয়া) একটি জিনঘটিত রোগ। পরীক্ষা করে জানা গেছে যে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন আর কাস্তে আকৃতির কোষ জনিত অ্যানিমিয়া রোগীর হিমোগ্লোবিন প্রোটিন-এর বিটা শৃঙ্খলে মাত্র একটি অ্যামিনো অ্যাসিড অবশেষের তারতম্য রয়েছে। গ্লুটামিক অ্যাসিড অবশেষের ( জলানুকূল চার্জড রেসিডিউ)-এর জায়গায় আছে ভ্যালিন অবশেষ ( জল-প্রতিকূল, নন-পোলার)। আর সেই কারণে এই ভয়াবহ রোগ যা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

ডি এন এ বা জিন স্তরে কি এমন হেরফের হল যে ভুল প্রোটিন তৈরি হল? আসলে জিন (ডি এন এ) পরিব্যক্ত হয়ে গেছে। ডি এন এ থেকে mRNA তৈরি হয়। সাধারণত যে mRNA কোডন GAG থেকে গ্লুটামিক অবশেষ নির্বাচন হতো এখন তার জায়গার GUG কোডন রয়েছে আর ভ্যালিন অবশেষ নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছে পয়েন্ট মিউটেশনের ফলস্বরূপ। (এখানে বলা প্রয়োজন যে ডি এন এ এর Thiamin (T) এর জায়গায় RNA তে Uracil (U) নিউক্লিওটাইড থাকে)। এই তিন অক্ষরের কোডন কি আর কিভাবে তা এই অ্যামিনো অ্যাসিড অবশেষ নির্বাচন করে সেটা পরে কোনো লেখাতে আসবে।
ভ্যালিনের জল-প্রতিকূল চরিত্রের জন্যই এই সমস্যা। এতে প্রোটিন-এর বাহ্যিক গঠনেরও পরিবর্তন হয়। যেহেতু এখন হেমোগ্লোবিন প্রোটিনটি জল-প্রতিকূল, তাই তা জল থেকে দূরে থাকতে চায়। জল-প্রতিকূল আন্তঃক্রিয়ার মাধ্যমে হেমোগ্লোবিন লম্বা লম্বা পলিমার গঠন করে। আর লাল রক্তকণিকার মধ্যে শক্ত তন্তু গঠন করে। ফলত রক্তকণিকা গোলাকার আকৃতির পরিবর্তে কাস্তের আকার ধারণ করে। এই লাল রক্তকণিকা তখন তার কোষপ্রাচীরের নমনীয়তা হারায়। রক্ত গোলাকার আকৃতির পরিবর্তনের কারণে নালীর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে বাধা পায় আর কণিকাগুলো ফেটে যায়, অর্থাৎ কোষের মৃত্যু ঘটে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী রক্তশূন্যতার সৃষ্টি হয় আর দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, হাত-পা ও হাড়ে ব্যথা, সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হওয়া প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। এ থেকে মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়।
সিকেল সেল অ্যানিমিয়া একটি বংশগত রোগ, যেটা মেন্ডেলীয় জিনতত্ত্ব মেনে চলে। যদি পিতা-মাতা দুজনেরই এই রোগ থাকে তবে সন্তানের এই রোগ হবেই (১০০%)। কিন্তু যদি পিতা-মাতার মধ্যে কেবল একজনের এই রোগ থাকে, আর অপর জন শুধুই রোগের জিন বাহন করে, তবে সন্তানের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০%। আবার ২৫% সম্ভাবনা থাকে যদি একজনের রোগ থাকে আর অন্যজন সম্পূর্ণ নীরোগ বা দুজনেই নীরোগ কিন্তু রোগবাহক। শেষোক্ত ক্ষেত্রে সন্তানের কোনো রোগলক্ষণ প্রকাশ পাবে না কিন্তু সে বাহক হতে পারে যদি পিতা মাতার মধ্যে একজন রোগের বাহক অন্যজন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়।
বর্তমানে নানা ধরনের ওষুধ দিয়ে ডাক্তাররা এ রোগের চিকিৎসা করছেন। তারপর অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করে রোগী সুস্থ থাকছে । সঠিক ওষুধ, ভ্যাকসিন, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং জীবনযাত্রার নিয়ম মানলে সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার রোগীরা অনেক ভালোভাবে দীর্ঘ জীবন যাপন করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 6 =