স্কিজোফ্রেনিয়ায় ‘কণ্ঠস্বর শোনা’-র অভিজ্ঞতাকে এতদিন রহস্যময়, ব্যক্তিগত আর প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই ধরা হত। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার UNSW সিডনির মনোবিজ্ঞানীদের নতুন এক গবেষণা বলছে, সমস্যাটা হয়তো বাইরে থেকে আসা কোনো অদৃশ্য কণ্ঠে নয় বরং নিজেরই মাথার ভেতরের স্বরকে চিনতে পারার ব্যর্থতায়। এটি এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে পরিষ্কার প্রমাণ বহন করছে যে স্কিজোফ্রেনিয়ায় শোনা কণ্ঠস্বর আসলে মানুষের নিজের ‘ইনার স্পিচ’। মানে মনের ভেতরের কথা। যাকে মস্তিষ্ক ভুল করে বাইরের শব্দ বলে ধরে নিচ্ছে। ইনার স্পিচ কী? খুব সহজভাবে বললে, এটা সেই ভেতরের কণ্ঠ, যা নীরবে আমাদের কাজ, পরিকল্পনা, ভাবনা বা আশপাশের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করে। অধ্যাপক টমাস হুইটফোর্ড বলছেন, “এটা আপনার মাথার ভেতরের ধারাভাষ্য। বেশিরভাগ মানুষই নিয়মিত এই ইনার স্পিচ অনুভব করেন, যদিও আমরা অনেকেই প্রায় সেটা খেয়াল করি না। আবার এমন মানুষও আছেন, যাদের প্রায় একেবারেই ইনার স্পিচ ব্যাপারটা হয় না।“ স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্ক নিজের কণ্ঠস্বরকে আগেভাগেই ‘চিনে’ ফেলে। আমরা যখন কথা বলি, এমনকি মনে মনে বললেও, মস্তিষ্ক আগেই আন্দাজ করে ফেলে কি শব্দ আসছে। ফলে শব্দ প্রক্রিয়াকরণের অংশটি একটু কম সক্রিয় হয়। এটাকে বলা যায় একধরনের ‘নিউরাল সাইলেন্সার’। নিজের কণ্ঠ বলে মস্তিষ্ক কোনো বাড়তি প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কিন্তু যাঁরা ‘কণ্ঠস্বর’ শোনেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ে। এই ধারণা অবশ্য নতুন নয়। প্রায় ৫০ বছর ধরেই মানসিক স্বাস্থ্যের গবেষণায় একটা তত্ত্ব উঠে আসছে। স্কিজোফ্রেনিয়ার অলীক শ্রবণ আসলে নিজের ভাবনাকে বাইরের কণ্ঠ বলে ভুল করা। সমস্যা ছিল একটাই। ইনার স্পিচ তো একেবারেই ব্যক্তিগত। সেটাকে মাপা যাবে কীভাবে? এখানেই আসে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফির ভূমিকা। এই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ রেকর্ড করতে পারে। আমরা যদিও ইনার স্পিচ শুনতে পাই না, কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিকই তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলে ছিলেন ৫৫ জন স্কিজোফ্রেনিয়া গোত্রের রোগী, যাঁরা সম্প্রতি কণ্ঠস্বর শুনেছেন। দ্বিতীয় দলে ছিলেন ৪৪ জন স্কিজোফ্রেনিয়া রোগী, কিন্তু তাদের সাম্প্রতিক কোনো অলীক শ্রবণ বিভ্রম ছিল না বা কখনওই হয়নি। তৃতীয় দলে ছিলেন ৪৩ জন সুস্থ মানুষ, যাঁদের স্কিজোফ্রেনিয়ার কোনো ইতিহাস নেই। সবাইকে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফির ক্যাপ পরিয়ে হেডফোনে শব্দ শোনানো হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তাঁদের মনে মনে ‘বাহ’ বা ‘বিহ’ উচ্চারণ করতে বলা হয়, আর একই সঙ্গে হেডফোনে এই শব্দগুলোর একটি শোনানো হয়। অংশগ্রহণকারীরা আগে থেকে জানতেন না, তারা যে শব্দটা কল্পনা করবেন, সেটা শোনা শব্দের সঙ্গে মিলবে কি না। তাতে দেখা যাচ্ছে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কল্পিত শব্দ আর শোনা শব্দ মিললে শ্রবণ কর্টেক্সে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ কমে যাচ্ছে। মানে, মস্তিষ্ক আগেই শব্দটা অনুমান করেছে, সব ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু যাঁরা সাম্প্রতিক কণ্ঠস্বর শুনেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটছে। মিল হওয়ার সময় তাঁদের মস্তিষ্ক আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে। যেন শব্দটা নিজের নয়, বাইরে থেকে আসছে। এই বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায় যে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্রিয়া কৌশলটাই ভেঙে যাচ্ছে। তাই নিজের ভেতরের বার্তাকে বাইরের কণ্ঠ বলে মনে হচ্ছে। আর সেই কারণেই কণ্ঠস্বরটাকে এতটা বাস্তব লাগে। দ্বিতীয় স্কিজোফ্রেনিয়া গ্রুপের প্রতিক্রিয়া ছিল মাঝামাঝি। না পুরো স্বাভাবিক, না পুরো বিভ্রমগ্রস্ত। এও একটা ইঙ্গিত যে , এই মস্তিষ্ক ঘটিত প্রতিক্রিয়া কণ্ঠস্বর শোনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এতদিন কোনো রক্তপরীক্ষা, ব্রেন স্ক্যান বা ল্যাব টেস্ট ছিল না যা স্কিজোফ্রেনিয়াকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে পারে। এই ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি ভিত্তিক প্যাটার্ন ভবিষ্যতে জৈব চিহ্নায়ক ( বায়োমার্কার ) হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে আগেভাগেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। হুইটফোর্ড এর মতে, “যদি আমরা আগে থেকে জানতে পারি, কারা গুরুতর সাইকোসিসের দিকে এগোচ্ছে, তাহলে চিকিৎসাও অনেক আগে শুরু করা যাবে। স্কিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গের জৈবিক কারণ বোঝা নতুন, কার্যকর চিকিৎসার প্রথম ধাপ।”
সূত্র: Corollary Discharge Dysfunction to Inner Speech and its Relationship to Auditory Verbal Hallucinations in Patients with Schizophrenia Spectrum Disorders. Schizophrenia Bulletin, 2025
