স্ক্রিনে ঠায় তাকিয়ে থাকার ক্লান্তি

স্ক্রিনে ঠায় তাকিয়ে থাকার ক্লান্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ মার্চ, ২০২৬

স্ক্রিনের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকার পর চোখে একটা অস্বস্তি হচ্ছে, এ অভিজ্ঞতা কম বেশি আমাদের সকলেরই। পড়াশোনা, অফিসের কাজ, কিংবা নিরন্তর স্ক্রল-ফোন আর ল্যাপটপের আলো চোখে এমনভাবে ঢুকে থাকে যে একসময় সবকিছু ঝাপসা আর অস্বস্তিকর লাগে। প্রশ্নটা সহজ, এটা কি কেবলই ক্লান্তি? আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অপথ্যালমোলজি জানাচ্ছে, স্ক্রিনের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকলে আমরা স্বাভাবিকের চেয়ে কম পলক ফেলি। সাধারণত মানুষ মিনিটে প্রায় ১৫ বার চোখের পাতা ফেলে। কিন্তু স্থির দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে এই হার অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। পলক ফেলা মানে তো শুধু চোখ বন্ধ–খোলা নয়। এটা চোখের উপর অশ্রুর পাতলা স্তরকে ছড়িয়ে দেয়। চোখের পাতা কম ফেলা মানে শুষ্কতা বেশি। আর শুষ্কতা মানেই চুলকানি, জ্বালা, ঝাপসা দেখা। ভারতের অরবিন্দ চক্ষু হাসপাতাল–এর গবেষক কিরণদীপ কৌর এবং তাঁর সহকর্মীরা ২০২২ সালে প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক গবেষণা বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই নতুন যুগের উপসর্গ- “ডিজিটাল আই স্ট্রেন”। সমস্যা শুধু চোখের পাতা কম ফেলা নয়। গবেষণায় উঠে এসেছে আরও কয়েকটি কারণ। যেমন, স্ক্রিনে লেখা ও ব্যাকগ্রাউন্ডের কনট্রাস্টের মাত্রা, স্ক্রিনের ঔজ্জ্বল্য ও প্রতিফলন, ভুল দূরত্ব ও ভুল কোণ থেকে দেখা, ঘরের অপর্যাপ্ত আলো, কুঁজো হয়ে বসা। এই সব মিলিয়ে চোখে তৈরি হয় এক অদৃশ্য চাপ। যার ফলে শুকনো চোখ, চুলকানি, চোখে কিছু ঢুকে থাকার অনুভূতি, জল পড়া, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া, এমনকি মাথাব্যথা প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ক্ষতি হয় কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা দরকার। কিন্তু অস্বস্তিটা বাস্তব, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকেই শুনেছেন, প্রতি ২০ মিনিটে ২০ ফুট দূরে ২০ সেকেন্ড তাকান। এটা কি কেবল ইন্টারনেট-পরামর্শ? সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন নিজেই এই পদ্ধতির সুপারিশ করছে। আসলে চোখের ফোকাস করার মাংসপেশি দীর্ঘ সময় কাছের জিনিসে আটকে থাকলে ক্লান্ত হয়। দূরে তাকালে সেই পেশি শিথিল হয়, পলক ফেলার হার বাড়ে, চোখের ওপর অশ্রুস্তর আবার ঠিকমতো ছড়িয়ে পড়ে। কৌর ও তাঁর সহকর্মীদের বিশ্লেষণও দেখায়, এই বিরতি চোখের চাপ কমাতে কার্যকর। তবে শুধু বিরতি তো নয়, অভ্যাস বদলও জরুরি। যেমন, দিনে চার ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনে না থাকা (সম্ভব হলে), ঘরে শুধুই স্ক্রিনের আলো নয়, পরিবেষ্টিত আলো রাখা, দীর্ঘ সময় কাজ করলে কন্ট্যাক্ট লেন্সের বদলে চশমা ব্যবহার করা উচিৎ। আর অবশ্যই যা করতে হবে, তা হল স্ক্রিন যেন চোখের সমতলের সামান্য নীচে থাকে এবং প্রায় এক হাত দূরত্বে থাকে। তবে সমস্যা আছে। কাজের চাপে আমরা বিরতি নিতে ভুলে যাই। এই জায়গায় প্রযুক্তিই আবার সমাধান দেয়। কিছু ফ্রি ও ওপেন সোর্স অ্যাপ আছে, যা উইন্ডোজ, ম্যাকওএস, লিনাক্স–এ চলে। নির্দিষ্ট সময় পরপর এটি স্ক্রিন ঢেকে দিয়ে আপনাকে বিরতি নেওয়ার মনে করিয়ে দেয়। সময়ের ব্যবধান আর বিরতির দৈর্ঘ্য- দুটোই নিজের মতো ঠিক করা যায়। ডিজিটাল যুগে চোখের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রযুক্তির এই আত্মসমালোচনাই যেন সবচেয়ে মজার। আমরা স্ক্রিন ছাড়তে পারব না। কাজ, শিক্ষা, বিনোদন সবই এখন আলো-ঝলমলে আয়তক্ষেত্রের ভেতর বন্দি। কিন্তু চোখের একটা জৈবিক সীমা আছে। মনে রাখতে হবে, চোখ আমাদের নীরব কর্মী। তারও একটু বিশ্রাম দরকার।

 

সূত্র: Popular Science; Health ; February, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + thirteen =