হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেম সেল জীববিজ্ঞানীরা প্রথম ল্যাবে তৈরি করেছেন কর্টিকোস্পাইনাল নিউরন । এটি মস্তিষ্কের সেই বিশেষ কোষ, যেগুলো আমাদের ইচ্ছামতো শরীর নাড়াচাড়া করার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। এই কোষগুলোই ধ্বংস হয়ে যায় Amyotrophic lateral sclerosis (ALS) রোগে। এরাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্পাইনাল কর্ডে আঘাত লাগলে। স্টিফেন হকিং এর মতো বিজ্ঞানী যৌবন কালে আক্রান্ত হয়ে সারা জীবন এ রোগে ভুগেছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণায় দেখা গেছে, বিজ্ঞানীরা এক ধরনের “মলিকিউলার ককটেল” অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক সংকেতের মিশ্রণ ব্যবহার করে প্রোজেনিটর কোষকে নতুন পরিচয় দিতে পারছেন। প্রোজেনিটর কোষ হলো স্টেম সেলের পরবর্তী ধাপের কোষ। তারা স্টেম সেলের মতো সব ধরনের কোষে রূপ নিতে পারে না, কিন্তু নমনীয় থাকে। সঠিক সংকেত পেলে তখন তারা নির্দিষ্ট ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে। এই গবেষণায় সেই প্রোজেনিটর কোষগুলোকে কর্টিকোস্পাইনাল নিউরনে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। হার্ভার্ডের অধ্যাপক জেফ্রি ম্যাকলিস এই আবিষ্কারকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর কথায়, “এই প্রোজেনিটর কোষগুলো ইতিমধ্যেই আমাদের মস্তিষ্কে উপস্থিত রয়েছে। তারা নিঃশব্দে সেখানে অবস্থান করছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে হয়তো বাইরে থেকে নতুন কোষ প্রতিস্থাপন না করেও, মস্তিষ্কের ভেতরের কোষকেই সক্রিয় করে নতুন নিউরন তৈরি করা সম্ভব হতে পারে”।
ALS একটি মারাত্মক স্নায়ুরোগ, যা ধীরে ধীরে শরীরকে পক্ষাঘাতে আবদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। কেন এই রোগে কর্টিকোস্পাইনাল নিউরন মারা যায়, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। অপরদিকে মেরুদণ্ড রজ্জু বা স্পাইনাল কর্ডে আঘাত লাগলে এই নিউরনের দীর্ঘ স্নায়ুতন্তু বা অ্যাক্সন ভেঙে যায়। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে শরীরের নিচের অংশে সংকেত পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৩ লাখ মানুষ এই ধরনের আঘাত নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। সমস্যা হলো, আমাদের শরীরের অনেক কোষ – যেমন ত্বক বা রক্ত – সহজে পুনর্গঠিত হতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের নিউরন সাধারণত নতুন করে তৈরি হয় না। তাই এই ধরনের স্নায়ুক্ষতি স্থায়ী হয়ে যায়। এখানেই প্রোজেনিটর কোষের গুরুত্ব । এই কোষগুলো ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট অঞ্চলে উপস্থিত এবং খানিকটা প্রস্তুত অবস্থায় থাকে। তাই তাদের নতুন নিউরনে রূপান্তর করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। গবেষণা দলটি মস্তিষ্কের কর্টেক্সের NG2 প্রোজেনিটর কোষ নিয়ে কাজ করেছে। সাধারণত এই কোষগুলো অলিগোডেন্ড্রোসাইট তৈরি করে। এগুলি স্নায়ুতন্তুর চারপাশে মায়েলিন নামের খোলস বা আবরণ তৈরি করে বৈদ্যুতিক সংকেত দ্রুত চলতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ করছিলেন, এই NG2 কোষের মধ্যে হয়তো নিউরন তৈরির সুপ্ত ক্ষমতা আছে, কিন্তু তা সক্রিয় হয় না। এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রথমে নির্দিষ্ট ধরনের প্রোজেনিটর কোষকে আলাদা করেন। তারপর তাদের ওপর বিশেষ রাসায়নিক সংকেত প্রয়োগ করেন। সে সংকেত ভ্রূণের বিকাশের সময়কার নিউরন তৈরির প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করে। এর ফলে কোষগুলো ধীরে ধীরে নতুন নিউরনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। তারা দীর্ঘ অ্যাক্সন তৈরি করে, তারা স্বাভাবিক কর্টিকোস্পাইনাল নিউরনের মতো আচরণ করে, দেখতেও একই রকম। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই নতুন কোষগুলোর জিনের কার্যকলাপ এবং বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যও স্বাভাবিক নিউরনের মতো। এ সাফল্য এক বড় অগ্রগতি। মস্তিষ্কে হাজার হাজার ধরনের নিউরন রয়েছে, এবং তারা প্রতিটি আলাদা রোগে আলাদাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নির্দিষ্ট রোগ বোঝার জন্য নির্দিষ্ট ধরনের নিউরন তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এই নতুন পদ্ধতি সেই সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই কাজ এখনও ল্যাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কে এই পদ্ধতি কাজ করবে কি না, তা ভবিষ্যতের গবেষণায় জানা যাবে। গবেষকরা বলছেন, এটি প্রথম ধাপ মাত্র। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিকে আরও উন্নত করা সম্ভব হবে। একদিন হয়তো বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের ভেতরেই নতুন নিউরন তৈরি করে পক্ষাঘাত বা স্নায়ুরোগের ক্ষতি আংশিকভাবে হলেও মেরামত করতে পারবেন।
সূত্র : The Harvard Gazette; February, 2026
