কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ডেটা সেন্টার সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে ট্রানজিস্টর। ক্ষুদ্র এই সুইচই বিদ্যুতের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে “অন” আর “অফ” দিয়ে তৈরি করে ডিজিটাল দুনিয়া । কিন্তু দশকের পর দশক সিলিকন-ভিত্তিক ট্রানজিস্টরকে ক্ষুদ্রতর ও দ্রুততর করার দৌড় এখন এক প্রকার দেওয়ালে এসে ঠেকেছে । শক্তি খরচ আর কমছে না, তাপ বেড়ে যাচ্ছে, আর কর্মক্ষমতা বাড়ানোর পথ ক্রমেই কঠিন হচ্ছে । এই প্রেক্ষাপটে নতুন দিশা দেখালেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-র প্রকৌশলীরা। তাঁরা তৈরি করেছেন এক নতুন ধরনের ম্যাগনেটিক ট্রানজিস্টর, যা সিলিকনের বদলে ব্যবহার করে চুম্বকীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত দ্বিমাত্রিক (2D) সেমিকনডাক্টর। প্রচলিত ট্রানজিস্টর ইলেকট্রনের চার্জ ব্যবহার করে কাজ করে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের এক মৌলিক সীমা, যাকে ‘সাবথ্রেশোল্ড লিমিট’ বলা হয়, সিলিকন ট্রানজিস্টরের শক্তি খরচ কমানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আরও শক্তি-দক্ষ, দ্রুত এবং কম তাপ উৎপাদনকারী ইলেকট্রনিক্সের খোঁজে বিজ্ঞানীরা বিকল্প পথ খুঁজছেন। এখানেই আসে “স্পিনট্রনিক্স”-এর ধারণা – ইলেকট্রনের চার্জের পাশাপাশি তার চুম্বকীয় স্পিনকে কাজে লাগানো। যদি স্পিন নিয়ন্ত্রণ করে সুইচ তৈরি করা যায়, তবে কম শক্তিতে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এতদিন বড় সমস্যা ছিল উপযুক্ত উপাদানের অভাব। এবার গবেষক দল একটি দ্বিমাত্রিক চুম্বকীয় সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করেছে, যার নাম ক্রোমিয়াম সালফার ব্রোমাইড (CrSBr)। এই উপাদান একদিকে সেমিকনডাক্টরের মতো বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে, অন্যদিকে এর চুম্বকীয় অবস্থা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। অর্থাৎ, বৈদ্যুতিক সংকেতের পাশাপাশি চুম্বকীয় অবস্থা বদলে ট্রানজিস্টর “অন” ও “অফ” করা যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ম্যাগনেটিক ট্রানজিস্টর খুব কম ভোল্টেজেই সুইচ অন করতে পারে। ফলে শক্তি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একই সঙ্গে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে এটি প্রচলিত সিলিকন ট্রানজিস্টরের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া দেখায় । উপরন্তু ডিভাইসটি একই সঙ্গে লজিক ও মেমরি হিসেবে কাজ করতে পারে। সাধারণ কম্পিউটার কাঠামোয় প্রসেসর ও মেমরি আলাদা। তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে সময় ও শক্তি খরচ হয়। কিন্তু যদি একটি উপাদানই গণনা ও তথ্য সংরক্ষণ দুই কাজ করতে পারে, তাহলে সার্কিট হবে ছোট, দ্রুত ও শক্তি-দক্ষ। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বড় তথ্য বিশ্লেষণ এবং উচ্চ-ক্ষমতার কম্পিউটিংয়ে এর প্রভাব বড় হতে পারে। ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচ কমানো আজ সারা বিশ্বের চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের প্রযুক্তি সেই চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এখনও অবশ্য এ সাফল্য গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ। বৃহৎ পরিসরে এর উৎপাদন, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, বিদ্যমান চিপ প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য- এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখনও বাকি । গবেষকেরা পরবর্তী ধাপে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডিভাইসকে আরও বাস্তবসম্মত ও শিল্প-উপযোগী করতে চান। সিলিকন প্রযুক্তি কয়েক দশক ধরে আমাদের ডিজিটাল বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তিরই সীমা আছে। এই উদ্ভাবন দেখাচ্ছে, ইলেকট্রনের চুম্বকীয় স্পিনকে কাজে লাগিয়ে সেই সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হতে পারে। ইলেকট্রনিক্সের ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো এসেছে ক্ষুদ্র উপাদানের ভেতর দিয়ে। ট্রানজিস্টর যেমন ভ্যাকুয়াম টিউবকে সরিয়ে দিয়েছিল, তেমনি ম্যাগনেটিক ট্রানজিস্টর হয়তো একদিন সিলিকনের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। ভবিষ্যতের কম্পিউটার শুধু ছোট আর দ্রুত হবে না, হবে আরও শক্তি-সাশ্রয়ী এবং বুদ্ধিমান । আর সেই ভবিষ্যতের দরজা খুলতে পারে এই ডিভাইসের হাত ধরে।
সূত্রঃ MIT News
