
হাতি খুব বড় ও শক্তি খরচকারী প্রাণী হওয়ায় তাদের চলাফেরা সহজ নয়। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে তারা খুব বুদ্ধিমানের মতো পথ বেছে নেয় যাতে কম শক্তি লাগে। ২০ বছরের বেশি জিপিএসের উপাত্ত (ডেটা) বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, হাতিরা সমতল ও খাবারসমৃদ্ধ জায়গায় বেশি চলাফেরা করে। তারা দ্রুত হাঁটার সময় কঠিন, উঁচু-নিচু বন্ধুর পথ এড়িয়ে যায়। এই গবেষণা থেকে বোঝা যায় হাতিরা অনেক বুদ্ধিমান ও পরিবেশের সাথে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। হাতির জীবন মোটেও সহজ নয়। বিশাল এই তৃণভোজী প্রাণীদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে কম-ক্যালোরির খাবার খেতে হয়। কিন্তু তাদের বড় শরীরের জন্য খাবার খুঁজতে ঘুরে বেড়াতেও বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় । সে কারণে বিভিন্ন বৃহত্তর ও কঠিন পরিবেশে, প্রতিটি পদক্ষেপই মূল্যবান। বর্তমানে বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া ও মানুষের কার্যকলাপের কারণে হাতির জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এমত অবস্থায় হাতির চলাচলের ধরন বোঝা খুব জরুরি। তবে এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারেননি কীভাবে হাতিরা পথনির্দেশ করে। বিজ্ঞানীরা এখন হাতির চলাচল নিয়ে নতুন তথ্য পেয়েছেন। সাম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় , জার্মান সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটিভ বায়োডাইভারসিটি রিসার্চ এবং ফ্রিডরিখ-শিলার-ইউনিভার্সিটি জেনার গবেষকদের পরিচালনায় একটি নতুন গবেষণা করা হয়েছে । বিজ্ঞানীরা ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলে ১৫৭টি আফ্রিকান হাতির উপর গবেষণা করেছেন। হাতিদের জিপিএস উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, তারা কীভাবে পথ বেছে নেয়। এই তথ্য দিয়েছে কেনিয়ার সংরক্ষণ সংস্থা সেভ দ্য এলিফ্যান্টস।হাতিরা মূলত এমন জায়গা পছন্দ করে যেখানে চলতে কম শক্তি খরচ হয় । বেশি পরিশ্রমের কারণে তারা খাড়া পাহাড় বা অমসৃণ পথ এড়িয়ে চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৪ শতাংশ হাতি এমন কঠিন পথ নির্বাচন করা থেকে বিরত থাকে । তারা এমন জায়গা বেছে নেয় যেখানে প্রচুর গাছপালা ও খাবার থাকে। ৯৩ শতাংশ হাতি বেশি খাবার পাওয়া যায় এমন এলাকায় থাকতে ভালোবাসে।জলের উৎসও হাতির চলাচলে ভূমিকা রাখে। কিছু হাতি সবসময় জলের কাছাকাছি থাকে, আবার কিছু হাতি দূরে চলে যায়। অর্থাৎ, তারা শুধু কাছের নদী বা পুকুরের দিকেই যায় না, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী পথ ঠিক করে।গতির ওপরও তাদের পথ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত অনেকটা নির্ভর করে। ধীরে চলার সময় বেশিরভাগ হাতি কঠিন পথ এড়িয়ে চলে। মাঝারি গতিতে চলার সময় এড়িয়ে চলার হার আরও বেড়ে যায়। আর খুব দ্রুত চলার সময় প্রায় সব হাতিই সহজ পথ বেছে নেয়।গবেষকদের মতে, হাতির চলার ধরন অনেকটা পাখির মতো। যেমন পাখিরা আকাশে উষ্ণ বাতাসের স্রোত ব্যবহার করে সহজে উড়তে পারে এবং কম শক্তি খরচ হয়, তেমনই হাতিরাও চলার সময় সহজ পথ বেছে নেয় যাতে তাদের পরিশ্রম কম হয়।গবেষকরা হাতির চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করতে ‘শক্তি-ভূদৃশ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি’ নামের
একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এটি হাতির শরীরের ওজন ও ভূমির ঢাল অনুযায়ী চলার শক্তি খরচ কেমন হবে তা অনুমান করে। এর সঙ্গে তারা উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে গাছপালার ঘনত্ব ও জলের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য যোগ করেন, যাতে বোঝা যায় হাতিরা কোন পথ বেছে নেয় এবং কেন নেয়।এছাড়া, ‘ধাপে-ধাপে পথ নির্বাচন ‘ নামের একটি পরিসংখ্যান পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়েছে। এর সাহায্যে বোঝা যায় হাতিরা যে যে জায়গায় গেছে, তার আশেপাশে আরও অনেক জায়গা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো তারা কেন বেছে নেয়নি। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা বুঝতে পেরেছেন, কোন পরিবেশগত কারণ হাতির চলাচলের সিদ্ধান্ত ও বসবাসের জায়গা নির্বাচনকে প্রভাবিত করে।এই গবেষণার ফলাফল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজে লাগতে পারে।গবেষকরা বলছেন, হাতির জন্য সংরক্ষিত এলাকা ও চলাচলের পথ এমনভাবে তৈরি করা উচিত যাতে তারা সহজে চলতে পারে এবং মানুষের দ্বারা কোনো ব্যঘাত না ঘটে ।এছাড়া, গবেষণা অনুযায়ী সব হাতি একইভাবে সমান জায়গা পছন্দ করে না। তাই সংরক্ষণ পরিকল্পনায় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি।গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাতির চলাচল বদলানোর আভাস আগেভাগে পাওয়া সম্ভব। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পথ চলার শক্তি খরচই বাড়ায় না, খাবার ও জলের প্রাপ্যতাও কমাতে পারে।গবেষকরা ভবিষ্যতে আরও ভালো গবেষণার মাধ্যমে ঋতু পরিবর্তন, মানুষের উপস্থিতি এবং জলবায়ুর প্রভাব কীভাবে হাতির চলার পথে পরিবর্তন আনে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করতে চান ।গবেষণার প্রধান ড. এমিলিও বার্টি বলেছেন, এই নতুন ফলাফল, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, হাতির চলাচলের পথ তৈরির সময় তাদের চলার শক্তি খরচের বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।