যে অতিকায় হাতি তার মোটা ভারী শুঁড় দিয়ে সহজেই গাছের গুঁড়ি টেনে সরাতে পারে, সেই একই প্রাণী আবার মাটিতে পড়ে থাকা একটি ছোট্ট চিনাবাদাম অবলীলায়, প্রায় নিঃশব্দ কোমলতায় তুলে নেয়। শক্তি আর সূক্ষ্মতার এই অবিশ্বাস্য সমন্বয় কেবল পেশির জোরে সম্ভব নয়; এর পেছনে কাজ করে এক জটিল ও সূক্ষ্ম স্পর্শ-প্রযুক্তি, যা সম্প্রতি বৈজ্ঞানিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে ।
২০১৭ সালে সায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে হাতির শুঁড়ের অগ্রভাগের আঁকড়ে ধরার শক্তি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, কীভাবে তারা ভারী বোঝা টানা থেকে শুরু করে অতিভঙ্গুর খাদ্যদ্রব্যও নিখুঁতভাবে ধরতে পারে। এই আবিষ্কারের সূত্র ধরেই সম্প্রতি জার্মানির একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী, রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ ও হ্যাপটিক ইন্টেলিজেন্স গবেষক হাতির শুঁড়ের সংবেদনশীলতার আরেকটি দিক উন্মোচন করেছেন। সেটা হল তাদের রোঁয়া বা হুইস্কার। নতুন গবেষণাপত্রে জানানো হয়েছে, এশীয় হাতির (এলিফাস মাক্সিমাস) রোঁয়া স্পর্শানুভূতির জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। গবেষকেরা বলেন, রোঁয়ার গঠন ও যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য এমন যে স্পর্শের অবস্থান ও তীব্রতা, কম্পনের মাত্রা ও কম্পাঙ্কের মাধ্যমে রোঁয়ার গোড়ায় স্নায়ুকোষে পৌঁছে যায়।
বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর রোঁয়া গাল বা থুতনির আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু হাতির ক্ষেত্রে প্রায় এক হাজারের মতো রোঁয়া শুঁড়ের পুরো দৈর্ঘ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। গবেষকেরা রোঁয়ার আকৃতি, দৃঢ়তা, ছিদ্রযুক্ত গঠন ও অভ্যন্তরীণ উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এগুলোর প্রতিটি বৈশিষ্ট্য স্পর্শ সংকেত পরিবহনের কাজে যুক্ত।
বিড়াল বা ইঁদুরের মতো কিছু প্রাণী নিজস্ব পেশির সাহায্যে রোঁয়া নাড়াতে পারে। কিন্তু হাতির রোঁয়া স্থির, এগুলো আলাদা করে নড়ে না, একবার ঝরে গেলে আর নতুন করে গজায়ও না । এগুলোর গোড়া শক্ত ও ডগা তুলনামূলক নরম ও রাবারের মতো। রোঁয়ার শিকড় তুলনামূলকভাবে বেশি ছিদ্রযুক্ত, আর ডগার অংশ ঘন ও শক্ত । গবেষকদের ধারণা, এই বিন্যাস যান্ত্রিক কম্পনকে বাড়িয়ে তোলে এবং তা রোঁয়ার গোড়ায় অবস্থিত সংবেদনশীল স্নায়ুতে আরও স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়।
হাতির দৃষ্টিশক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তাই শুঁড়ের ওপরের লোমশ রোঁয়াই তাদের “স্পর্শ-নির্ভর বুদ্ধিমত্তার” ভিত্তি। প্রতিটি ছোঁয়া তাদের কাছে একেকটি তথ্য-বার্তা—আকার, গঠন, অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সংকেত।
মোটকথা হাতির রোঁয়া শুঁড়ের সংবেদনশীল ক্ষমতাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। এ কারণেই বিশাল এই প্রাণী তার শক্তিশালী শুঁড় দিয়ে যেমন ভারী গাছ টানতে পারে, তেমনি মাটিতে পড়ে থাকা ছোট্ট একটি চিনাবাদামও নিখুঁতভাবে তুলে নিতে সক্ষম হয়।
সূত্র: Nautilus Magazine,February 17th 2026.
