হাতির হাড়ের হাতুড়ি : প্রাগৈতিহাসিক প্রযুক্তি

হাতির হাড়ের হাতুড়ি : প্রাগৈতিহাসিক প্রযুক্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র “বক্সগ্রোভ আর্কিওলজিক্যাল সাইট” খননের ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় ৫ লক্ষ বছর পুরোনো একটি হাতিয়ার। হাতিয়ার তো অনেকই আবিষ্কার হয়েছে কিন্তু এই হাতিয়ারটির বিশেষত্ব হল , এটি তৈরি হয়েছে হাতির হাড় থেকে। তার থেকেও বড় কথা এটা আসলে এক বিশেষ ধরনের হাতুড়ি। প্রাচীন মানুষ এটি পাথরের অস্ত্র ও সরঞ্জাম শান দিতে ব্যবহার করত। অর্থাৎ, তারা অস্ত্রশস্ত্র বানিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, তাকে কিকরে আরও ব্যবহারপযোগী করা যায় সেই ভাবনাও ভেবে রীতিমত উপায়ও বার করেছে।

এই বিশেষ গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এবং লন্ডনের ন্যাচরাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। তাদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান পত্রিকা সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে। এই আবিষ্কার ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য তুলে ধরেছে।

হাতিয়ারটি প্রায় ১১ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ত্রিভুজাকৃতির। এর পৃষ্ঠে যেসব দাগ ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, সেগুলো দেখে বোঝা যায় এটি ভেবে চিন্তে তৈরি করা হয়েছিল। গবেষকেরা উন্নত ত্রিমাত্রিক স্ক্যানিং ও ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ব্যবহার করে দেখেছেন, এর গায়ে ছোট ছোট ফ্লিন্ট পাথরের কণা আটকে আছে। এই প্রমাণ থেকেই তারা নিশ্চিত হন যে হাড়ের এই বস্তুটি পাথরের সরঞ্জাম তৈরি বা ধারালো করার সময় বারবার আঘাত করার কাজে ব্যবহৃত হত।

এই ধরনের হাতিয়ারকে প্রত্নতত্ত্বে “রিটাচার” বলা হয়। পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করতে করতে ভোঁতা হয়ে গেলে, এই নরম হাতুড়ির আঘাতে তার ধার পুনরুদ্ধার করা হত। কারণ হাড় তো পাথরের তুলনায় নরম, তাই এটি ব্যবহার করলে পাথরের প্রান্তকে আরও সূক্ষ্মভাবে গড়ে তোলা যায়।

গবেষকদের মতে, এই হাতিয়ারটি তৈরি করেছিল সম্ভবত প্রাচীন নিয়ান্ডারথালদের পূর্বপুরুষ অথবা হোমো হাইডেলবার্জেনসিস নামের এক প্রাচীন মানবপ্রজাতি। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো, সেই সময় দক্ষিণ ইংল্যান্ডে হাতি বা ম্যামথ প্রায় ছিল না বললেই চলে। সুতরাং হাতির হাড় পাওয়া মানেই প্রকারান্তরে কোনো দুর্লভ সম্পদের হদিশ পাওয়াই মতো। এই হাড় সংগ্রহ করে তা বিশেষভাবে ব্যবহার করার ঘটনা প্রমাণ করে যে সেই সময়ের মানুষদের পরিবেশের উপকরণ সম্পর্কে বেশ গভীর জ্ঞান ছিল।

এ আবিষ্কার আরও একবার প্রাগৈতিহাসিক মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার নতুন প্রমাণ দিল। তারা শুধু পাথরের সরঞ্জাম বানাতেই পারত না, বরং সেই সরঞ্জামকে কি করে আরও উন্নত করা যেতে পারে তার জন্য আলাদা সহায়ক যন্ত্রও তৈরি করত। প্রায় ৫ লক্ষ বছর আগে ইউরোপে বসবাসকারী মানুষের চিন্তাশক্তি ও পরিকল্পনার ক্ষমতাকে আমরা এতদিন যতটা উন্নত ভাবতাম, আসলে তা তার চেয়েও বেশি উন্নত ছিল। এই হাতির হাড়ের ছোট্ট হাতুড়িটি সেই অভাবনীয় সত্যকেই জনসমক্ষে প্রতিফলিত করলো।

 

সূত্র: “The earliest elephant-bone tool from Europe: An unexpected raw material for precision knapping of Acheulean handaxes” by Simon A. Parfitt and Silvia M. Bello, 21 January 2026, published in Science Advances.

DOI: 10.1126/sciadv.ady1390

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 10 =