হাতের লেখা বাড়ায় শেখা 

হাতের লেখা বাড়ায় শেখা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ডিজিটাল যুগে আঙুলের ব্যবহার স্ক্রিন জুড়ে। অথচ হঠাৎই অতীতের এক প্রায় বিস্মৃত ক্রিয়া আবার ক্লাসরুমে ফিরে আসছে— টানা হাতের লেখা। যুক্তাক্ষর, বেঁকে যাওয়া লুপ, এক অক্ষর থেকে আরেক অক্ষরে অনায়াসে গড়িয়ে যাওয়া কলমের দাগ – এই লেখার ধরন এক সময় শৈশবের অনিবার্য অনুশীলন ছিল। কিন্তু গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ড, সুইটজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে তা পাঠ্যক্রম থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়ে গেছে। ট্যাবলেট, ল্যাপটপ আর স্মার্টবোর্ডের যুগে হাতের লেখা ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে বিবেচিত। অথচ আমেরিকার নিউ জার্সি রাজ্য এখন আবার বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে টানা হাতের লেখা শেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের (প্রায় ৮–১১ বছর) টানা হাতে লিখতে শিখতেই হবে। গত সপ্তাহে, কার্যকালের শেষ ক’দিনে বিলটিতে সই করে বিদায়ী গভর্নর ফিল মারফি বলেন, “কার্সিভ শেখা শিশুদের বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে”। নিউ জার্সি একা নয়। গত দশ বছরে প্রায় দুই ডজন মার্কিন রাজ্য একই পথে হেঁটেছে। ফ্রান্স, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশে তো আবার টানা হাতের কার্সিভ লেখা কখনো ক্লাসরুম থেকে সরানোই হয়নি। কিন্তু মূল প্রশ্নটা আবেগের নয়, বিজ্ঞানের। সত্যিই কি টানা হাতে লেখার আলাদা কোনো স্নায়বিক জাদু আছে? হাতের লেখা বনাম টাইপিং-এই লড়াইয়ে গবেষকরা মোটামুটি একমত। টাইপ করার তুলনায় হাতে লেখা মস্তিষ্কের জন্য অনেক বেশি শ্রমসাধ্য এবং উদ্দীপক। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের ডেভেলপমেন্টাল নিউরোসায়েন্টিস্ট কারিন হারম্যান জেমস ২০০৪ সাল থেকে হাতের লেখা নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর আগ্রহের কেন্দ্র হল, শিশুদের সূক্ষ্ম চলন পটুতা কীভাবে শেখার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। জেমস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে এখন কার্সিভ না জানাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও সাধারণত কার্সিভে লেখে না”। একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণায়, যেসব শিশু এখনও পড়তে শেখেনি, তাদের দু’দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে অক্ষর হাতে লিখতে শেখানো হয়, অন্য দলকে কিবোর্ডে টাইপ করতে দেওয়া হয়। পরে ফাংশনাল এম আর আই স্ক্যানের সময় তাদের সেই অক্ষরগুলির ছবি দেখানো হয়। তাতে দেখা যাচ্ছে, যারা হাতে লিখতে শিখেছিল, তাদের মস্তিষ্কে সক্রিয় অংশগুলো ছিল প্রায় প্রাপ্তবয়স্কদের পড়ার সময় ব্যবহৃত নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো। টাইপিং শেখা শিশুদের ক্ষেত্রে সেই প্যাটার্ন দেখা যায়নি। বার্তাটা পরিষ্কার। হাতে লেখা, শিশুদের অক্ষর ও সংখ্যা চিনতে সাহায্য করে। জেমসের ভাষায়, “লেখার শারীরিক প্রক্রিয়াটাই যেন শেখার চাবিকাঠি।” নরওয়ের ট্রনডহাইমে অবস্থিত নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির স্নায়ু বিজ্ঞানী অড্রে ভ্যান ডার মিয়ার শিশুদের মাথার ত্বকে তড়িৎদ্বার বসিয়ে হাতে লেখা ও টাইপিংয়ের সময় মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ তুলনা করে দেখেন। দেখা যায়, হাতে লেখার সময় শেখার ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্ককেন্দ্রগুলিতে তীব্র সক্রিয়তা তৈরি হয়, যা টাইপিংয়ের সময় প্রায় অনুপস্থিত থাকে। ভ্যান ডার মিয়ারের মতে, “টাইপিং মূলত আঙুলের কয়েকটি সরল নড়াচড়া, কিন্তু হাতে লেখার সময় তৈরি হয় জটিল চলন প্যাটার্ন”। সমস্যা হলো, নরওয়ের কিছু স্কুল এতটাই ডিজিটাল হয়ে গেছে যে ছয় বছরের শিশুরা স্কুলের প্রথম দিনেই হাতে ট্যাবলেট পায়। তাতে দেখা যাচ্ছে, “প্রথম শ্রেণির শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন, অনেক বাচ্চাই ঠিকভাবে পেন্সিল ধরতে জানে না”। তাঁর দল এখন নরওয়ের সরকারকে আবার হাতের লেখা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করছে। হাতের লেখা বনাম প্রিন্ট নিয়ে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ভার্জিনিয়া বার্নিঙ্গার প্রায় তিন দশক ধরে কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রিন্ট বা ম্যানুস্ক্রিপ্ট লেখাই বেশি কার্যকর। কারণ, শিশুদের পড়ার বই প্রায় সবই সেই স্টাইলে লেখা। “প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটেটস পারসেপশন” অর্থাৎ নিজে কিছু করলে সেটা শেখাকে মজবুত করে। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণি থেকে হাতের লেখা শেখার কিছু সুবিধা দেখা যায়। এতে বিশেষ করে বানান ও লেখার গতি বাড়ে। তবে কানাডার একটি গবেষণা আবার বলছে, শুরু থেকেই একটিমাত্র লেখার ধরন শিখলে, তার সে হাতের লেখাই হোক বা প্রিন্ট হোক, বানান ও ভাষাগত দক্ষতা ভালো হতে পারে।

 

সূত্র: Nature, February, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + 8 =