
প্রতি বছর পরিযায়ী মরশুমে অনেক পাখি হয়ে ওঠে আক্ষরিক অর্থেই দুর্দান্ত উড়ানবিদ। প্রতি সেকেন্ডে ডানা ঝাপটায় কয়েকবার, টানা আট ঘণ্টা বিনা বিরতিতে উড়তে থাকে। তুলনা করলে, মানুষের পক্ষে কয়েক দিন ধরে বিনা বিরতিতে দৌড়ানো, জল ও খাবার ছাড়া, প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার।
অথচ মাত্র এক আউন্স ওজনের হোয়াইট-ক্রাউন্ড স্প্যারো প্রতি বসন্তে মেক্সিকো থেকে আলাস্কা পর্যন্ত প্রায় ২,৬০০ মাইল উড়ে যায়, কখনও কখনও এক রাতে ৩০০ মাইল অতিক্রম করে। আর্কটিক টার্ন আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, কুমেরু মন্ডল থেকে কুমেরু পর্যন্ত ১০,০০০ মাইলেরও বেশি, আর গ্রেট স্নাইপ মরুভূমি ও সমুদ্রের উপর দিয়ে চার দিনে প্রায় ৪,২০০ মাইল উড়ে যায় বিন্দুমাত্র না থেমে।
ওকলাহোমা মেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মাইটোকন্ড্রিয়াল ফিজিওলজি ও পেশী বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ পাওলো মেস্কিটা বলেন, “আমরা অবাক হয়েছিলাম—এত ছোট পাখি কিভাবে এত উচ্চমাত্রার কসরত করে হাজার হাজার মাইল উড়ে যেতে পারে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ ৫ কিলোমিটার দৌড়তেই হাঁপিয়ে যায়?”
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই জানেন যে, অভিবাসনের আগে ও সময়ে পাখির দেহে কয়েকটি শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। কেউ কেউ এত বেশি চর্বি জমায় যে ওজন দ্বিগুণ হয়ে যায়, কারও হৃদযন্ত্র বড় হয়ে যায়, আবার কারও হজমতন্ত্র ফুলে উঠে পরে সঙ্কুচিত হয়। কিন্তু সম্প্রতি গবেষকরা মনোযোগ দিয়েছেন একেবারে কোষীয় পর্যায়ে । তাঁরা জানার চেষ্টা করছেন, পাখিদের এত দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার জন্য যে বিপুল শক্তির প্রয়োজন, সেটা তারা পায় কোথা থেকে?
২০২৪ সালের দুটি স্বতন্ত্র গবেষণা থেকে জানা যায়, এই শক্তির মূল চাবিকাঠি হলো মাইটোকন্ড্রিয়া – কোষের শক্তিঘর । মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা, আকার, কার্যক্ষমতা ও পারস্পরিক সংযোগে সূক্ষ্ম পরিবর্তনই পাখিদের মহাদেশ-ব্যাপী উড়ানে সক্ষম করে।
অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবৃত্তীয় বাস্তুবিদ ওয়েন্ডি হুড বলেন, মানুষের মতো পাখিদের দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণের দরকার হয় না। বসন্ত এলেই, দিনের আলোর সময়সীমা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তাদের দেহ নিজে থেকেই আরও বেশি ও উচ্চমানের কোষীয় অঙ্গাণু মাইটোকন্ড্রিয়া তৈরি শুরু করে।
রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী শারীরবৃত্তীয় বাস্তুবিদ অধ্যাপক স্কট ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, এটি ফেনোটাইপিক নমনীয়তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ , যেখানে জিন কাঠামো বদলায় না, কিন্তু পরিবেশের প্রভাবে দেহে বিশাল অভিযোজন ঘটে।
আমরা জানি, মাইটোকন্ড্রিয়া অক্সিজেন ও গ্লুকোজ/ফ্যাটি অ্যাসিড ব্যবহার করে অ্যাডেনোসিন ট্রাই ফসফেট (এটিপি) তৈরি করে, যা জীবদেহের জীবনীশক্তির যোগানদার। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সব মাইটোকন্ড্রিয়া সমান নয়। কিছু মাইটোকন্ড্রিয়া বেশি দক্ষতার সাথে এটিপি তৈরি করে, কেউ আকার বদলাতে পারে (সংযুক্ত বা বিভক্ত হতে পারে), এমনকি কোষ থেকে কোষে স্থানান্তরিতও হতে পারে। অর্থাৎ মাইটোকন্ড্রিয়া শুধু শক্তি সরবরাহই করে না, প্রাণীর আচরণ ও বিবর্তনেও প্রভাব ফেলে।
যেমন শীতঘুমে যাওয়া মেঠো কাঠবিড়ালি শীতকালে শক্তি সাশ্রয়ের জন্য মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেয়। এখান থেকেই কানাডার গবেষক ক্রিস্টোফার গুগলিয়েলমো অনুপ্রাণিত হন। তিনি দেখেন, পরিযায়ী পাখিরা ঠিক উল্টো কাজ করে। তারা তাদের মাইটোকন্ড্রিয়ার শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা অতিমাত্রায় সক্রিয় করে নিজেদের উড়ান ক্ষমতা বাড়ায়।
গুগলিয়েলমো ও সোরেন কুলসন হুলুদ লেজওয়ালা সুমধুর কণ্ঠী পাখি(yellow-rumped warbler ) নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁরা শরতের পরিযায়ী মরশুমে কিছু পাখি ধরে ল্যাবে এনে দুটি দল বানান — “পরিযায়ী”ও “অপরিযায়ী” (আলো অন্ধকারের সময়সূচি বদলে দিয়ে)। পরে তাদের বুকের উড্ডয়ন পেশি থেকে মাইটোকন্ড্রিয়া আলাদা করে নিয়ে দেখা হয়, অক্সিজেন খরচের হার কত। দেখা যায় পরিযায়ী অবস্থায় থাকা পাখিদের মাইটোকন্ড্রিয়া বেশি শক্তি উৎপাদনে সক্ষম। যা কিনা যাত্রা শেষে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
কুলসন বলেন , “সব টার্বোচার্জড মাইটোকন্ড্রিয়া পরে সাধারণ মাইটোকন্ড্রিয়ায় পরিণত হয়, অতিরিক্তগুলো বাদ পড়ে—যাতে অপ্রয়োজনীয় সময়ে শক্তি অপচয় না হয়।”
অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমা রোডস ও পাওলো মেস্কিটা ভিন্ন পদ্ধতিতে গবেষণা করেছেন। তারা ল্যাবের পরিবর্তে সরাসরি মাঠে যান, একটি মাঝারি আকৃতির RV ভ্যানকে “MitoMobile” এ রূপান্তর করেন। তার ভেতরে ছিল সেন্ট্রিফিউজার, অক্সিজেন মাপার যন্ত্র, ল্যাব বেঞ্চ। তাঁরা দুটি উপপ্রজাতির হোয়াইট-ক্রাউন্ড স্প্যারো নিয়ে পরীক্ষা করেন—১)গ্যাম্বেল’স স্প্যারো (আলাস্কা–ক্যালিফোর্নিয়া যাতায়াতকারী) এবং ২)নাটাল’স স্প্যারো (ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের স্থায়ী বাসিন্দা)।
দেখা যায়, পরিযায়ী চড়ুইদের উড্ডয়ন-পেশিতে (পেক্টোরাল পেশি) মাইটোকন্ড্রিয়া শুধু বেশি নয়, অক্সিজেন ব্যবহারে আরও দক্ষ। এবং এই পরিবর্তন পরিযান শুরুর আগেই শুরু হয়। পরিযায়ী পাখিদের বুকের পেশিতে মাইটোকন্ড্রিয়ার আকার পরিবর্তনের জন্য দায়ী বিশেষ প্রোটিনের উপস্থিতি বেশি থাকে, যা অক্সিজেন গ্রহণক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ কিছু মাইটোকন্ড্রিয়া পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে এটিপি উৎপাদন বাড়ায়, অন্যগুলো বিভক্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বাদ দেয়। এই আকৃতিগত পরিবর্তনই সম্ভবত পাখিদের দীর্ঘ উড়ানের শক্তি জোগায়, যা তাদের ক্ষুদ্র দেহকে বিশাল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রমের ক্ষমতা দেয়।
তবে শক্তি উৎপাদনের সময় মাইটোকন্ড্রিয়া বিক্রিয়াশীল অক্সিজেনজাত ক্ষুদ্রক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করে, যারা কোষের ক্ষতি , ডি এন এ নষ্ট ও হৃদরোগসহ নানা ক্ষতি করতে পারে। পাখিরা কীভাবে এর মোকাবিলা করে? একটি উত্তর হতে পারে খাদ্যাভ্যাস।
স্কট ম্যাকউইলিয়ামসের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিযায়ী পাখিরা স্বাভাবিকভাবেই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল খেতে পছন্দ করে, যেমন- ভিটামিন ই। পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে, প্রশিক্ষিত উড়ন্ত পাখিদের উড্ডয়নপেশির মাইটোকন্ড্রিয়াতেও ভিটামিন ই প্রবেশ করতে পারে, যা বিক্রিয়াশীল অক্সিজেনজাত ক্ষুদ্রক্ষুদ্র কণিকা-জনিত ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।
মেস্কিটা এখন মানুষের উপর এর কি প্রভাব পড়তে পারে সেই নিয়ে গবেষণা করছেন। মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা ও দক্ষতা কৃত্রিমভাবে বাড়ালে কি মানুষের বার্ধক্য রোধে সাহায্য হতে পারে? তত্ত্বগতভাবে, বিশেষ ব্যায়াম বা ওষুধ হয়তো পাখিদের মতো মাইটোকন্ড্রিয়া “রিমডেলিং” ঘটাতে পারে।
তাঁর মতে, “মাইটোকন্ড্রিয়াই প্রাণশক্তির মূল কেন্দ্র”—কারণ এগুলোই দেহের বহু অভিযোজন ও রোগের মূল চাবিকাঠি। মানুষের ব্যায়াম থেকে পাখির পরিযান—সবই এই ক্ষুদ্র অঙ্গাণুর সঙ্গে যুক্ত। এ এক চমৎকার অভিযোজন কৌশল, যা মানুষের ক্ষেত্রেও একদিন প্রযোজ্য হতে পারে।
সূত্র: Avian erythrocytes have functional mitochondria, opening novel perspectives for birds as animal models in the study of ageing by Antoine Stier, et.al ;Frontiers in Zoology 10(1):33
DOI:10.1186/1742-9994-10-33 (June 2013).