মস্তিষ্ক কিভাবে স্মৃতি বাছাই করে? 

মস্তিষ্ক কিভাবে স্মৃতি বাছাই করে? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

আমরা প্রতিদিন যে নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, তার সবকটিই দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে পরিণত হয় না। কিছু অভিজ্ঞতা দ্রুত হারিয়ে যায়, আবার কিছু এতোটাই অর্থবহ হয় দীর্ঘদিন থেকে যায়। কোন অভিজ্ঞতা টিকে থাকবে আর কোনটি চিরতরে হারিয়ে যাবে এই নির্বাচন-প্রক্রিয়াটি কে পরিচালনা করে? এ তো বহুদিনের মৌলিক বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। অবশেষে রকিফেলার ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক একটি গবেষণা সেই প্রশ্নের উত্তরে যথাসম্ভব আলোকপাত করেছে।

গবেষণাটি দেখাচ্ছে যে স্মৃতি সংরক্ষণ কোনো একক, সোজাসাপ্টা প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একাধিক ধাপ, ভিন্ন ভিন্ন মস্তিষ্ক অঞ্চল এবং জটিল আণবিক নিয়ন্ত্রকের সমন্বয়ে গঠিত।

দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা ছিল, হিপোক্যাম্পাস স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি ধারণ করে এবং কর্টেক্স দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি সংরক্ষণ করে। কিন্তু এই দুই অঞ্চলের মধ্যবর্তী ধাপগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে—তা স্পষ্ট ছিল না। এ গবেষণা থেকে জানা যায় , এই দুইয়ের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে মস্তিষ্কের থ্যালামাস নামক অংশটি। থ্যালামাস শুধু স্মৃতির গুরুত্ব মূল্যায়নই করে না, কোন স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য কর্টেক্সে পাঠানো উচিত তাও নির্ধারণ করে। অর্থাৎ থ্যালামাস হল স্মৃতি-নির্বাচনের এক ‘কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগ্রহণ কেন্দ্র’।

এক্ষেত্রে রকিফেলার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ইঁদুরকে নিয়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির এক অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেন ।দেখা যায়, অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি স্মৃতির স্থায়িত্বের একটি প্রধান নির্ধারক। যেসব অভিজ্ঞতা বেশি পুনরাবৃত্ত হয়, সেগুলো ধাপে ধাপে আরও শক্তিশালী আণবিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ পায়।

এরপর CRISPR-ভিত্তিক জিন-স্ক্রিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সক্রিপশনাল নিয়ন্ত্রক চিহ্নিত করেন—থালামাসে Camta1 ও Tcf4, এবং কর্টেক্সে Ash1l। এগুলো প্রাথমিক স্মৃতি গঠনে প্রয়োজন না হলেও, স্মৃতিকে স্থায়ী রাখতে অপরিহার্য। প্রথমে Camta1 স্মৃতিকে সাময়িকভাবে স্থিতিশীল করে, এরপর Tcf4 সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুযোজককে আরও দৃঢ় করে। সর্বশেষ পর্যায়ে Ash1l ক্রোমাটিন পরিবর্তন ঘটিয়ে স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব প্রদান করে। এই ধাপে-ধাপে ‘টাইমার’-নির্ভর প্রক্রিয়াটিই নির্ধারণ করে কোন স্মৃতি টিকে থাকবে আর কোনটি হারিয়ে যাবে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, Ash1 যেই প্রোটিন পরিবারের অন্তর্গত, সেটি ইমিউন সিস্টেম ও কোষ-পরিচয় রক্ষার মতো অন্যান্য জৈবিক ব্যবস্থাতেও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি ধরে রাখার কাজে লাগে। অর্থাৎ মস্তিষ্ক সম্ভবত এই সামগ্রিক জৈবিক কৌশলটিকেই বুদ্ধিবৃত্তিক স্মৃতির ক্ষেত্রে পুনরায় ব্যবহার করছে।

এই নতুন অন্তর্দৃষ্টি ভবিষ্যতের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে আলঝাইমারের মতো রোগে যখন স্মৃতি-সম্পর্কিত স্নায়ু-পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এর সাহায্যে বিকল্প স্নায়ু-পথ সক্রিয় করে স্মৃতি সংরক্ষণের নতুন সমাধান উদ্ভাবনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

 

মোটের ওপর গবেষণাটি প্রমাণ করছে—দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি গঠন একটি বহুপদক্ষেপ সমন্বিত সময়নিয়ন্ত্রিত ও উচ্চমাত্রায় সংগঠিত প্রক্রিয়া, যা আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোর স্থায়িত্ব নির্ধারণে মস্তিষ্কের গভীরতর সমন্বয়কে তুলে ধরে।

 

সূত্র : How the Brain Chooses What to Remember and What to Forget

By Rockefeller University, published in Nature, 26th November,2025.

DOI: 10.1038/s41586-025-09774-6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − seven =