প্রস্তরযুগের নৌকো চেপে সাগরপাড়ি

প্রস্তরযুগের নৌকো চেপে সাগরপাড়ি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ জানুয়ারী, ২০২৬

প্রায় ৩৫০০০ বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স-এর আবির্ভাব ঘটেছিল জাপানের রিয়ুকু দ্বীপপুঞ্জে। জায়গাটা তাইওয়ানের উপকূল থেকে দেখা যায় না। দ্বীপগুলোকে দেখা যায় কেবল পূর্ব তাইওয়ানের উচ্চতম স্থানগুলি থেকে। একবার সমুদ্রে ভেসে পড়লে পর সাগরযাত্রীদের কাছে দ্বীপগুলো অদৃশ্যই হয়ে থাকে, যতক্ষণ না তারা কূলের একেবারে কাছে গিয়ে পৌঁছচ্ছে। কাজেই জলপথে ওই রাস্তা পার হওয়ার জন্য, বিশেষ করে ওখানকার তীব্র স্রোত ঠেলে ডাঙায় পৌঁছতে হলে উপযুক্ত জলযান আর উন্নত নৌ কৌশল আবশ্যিক। অতকাল আগে কী করে এটা সম্ভব হল তা বোঝবার জন্য ইউসুকে কাইফুর নেতৃত্বে আর ইয়ু-লিন চাং-এর নেতৃত্বে দুটি দল একজোট হয়ে কাজে নামল। কাইফুর দল আগে এ নিয়ে কাজ করে দেখেছিলেন বাঁশের কিংবা খাগড়ার তৈরি ভেলায় করে ওই পথ পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। এইবার তাঁরা বাঁশ বা খাগড়ার বদলে অন্য এক প্রাচীন জাপানি জলযানের আশ্রয় নিয়েছেন। সেটা হল এক ধরণের খোঁদল-করা ক্যানু নৌকো। প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই প্রাচীন নৌকোর ধংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলেন। সেগুলি থেকে সূত্র নিয়ে প্রস্তর যুগের পাতলা পাতের তৈরি পাথুরে কুড়ুলের সাহায্যে তাঁরা একটা জাপানি সেডার গাছ কেটে নেন। তারপর তার গুঁড়িটাকে আগুনে ঝলসে নিয়ে অন্যান্য পাথুরে হাতিয়ার দিয়ে একখানা সাড়ে সাত মিটার লম্বা খোঁদল-কাটা ক্যানু নৌকো বানান। উপকূল থেকে দূরবর্তী স্থানে পরীক্ষা করে দেখা গেল, নৌকোটা ভারসাম্যযুক্ত।

অপর দিকে চ্যাং-এর দলটি জলের তীব্র “কুরোশিয়ো” স্রোতের আচরণের ভিত্তিতে একটি মডেল তৈরি করার ওপর  মনোযোগ দিলেন। উদ্দেশ্য হল কী ধরণের পরিস্থিতিতে ভেসে ওই খোঁদল-কাটা ক্যানু নৌকোটা পাড়ি দেবে তা নির্ণয় করা। একটি সুপার কম্পিউটারে তাঁরা জোয়ার-ভাঁটা আর স্রোতের অন্যান্য পরিবর্তনের ও শক্তির আঙ্কিক সিমুলেশন   চালালেন। বর্তমান অবস্থার সঙ্গে প্রাচীন প্রস্তরযুগের অবস্থার সম্মিলন ঘটিয়ে কোথা থেকে কখন নৌকো ছাড়া হবে তার সবচেয়ে অনুকূল স্থান আর সময় শনাক্ত করলেন। ৭ জুলাই, ২০১৯ পাঁচজন অভিজ্ঞ নৌকো চালককে নিয়ে তাইওয়ানের উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁর এসে পৌঁছলেন জাপানের রিয়ুকু দ্বীপপুঞ্জে, সময় লাগল ৪৫ ঘণ্টা। এ প্রকল্পটি চমকপ্রদ এইজন্য যে এতে বিজ্ঞানের নানা শাখা যৌথভাবে কাজ করেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রত্নতাত্ত্বিক সমস্যা সমাধানের জন্য সুপারকম্পিউটার কাজে লাগিয়েছেন। অন্যান্য সাগর-অভিবাসনগুলি কী করে হয়েছিল তা বোঝবার ক্ষেত্রে তাঁদের এই সমাধানের তাৎপর্য অনেক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাচীনকালের কাঠ ও পাথর প্রযুক্তি-চালিত পরীক্ষানিরীক্ষা। ঐ দ্বীপপুঞ্জে মানুষ কীভবে এসে থাকতে লাগল সে বিষয়ে এ হয়তো শেষ কথা নয়। কিন্তু প্রস্তরযুগের সেইসব সাগরযাত্রীদের হিম্মত আর ক্ষমতার বিষয়ে অনেক কিছুই এ থেকে স্পষ্ট। কোথায় তখন সুপারকম্পিউটার! কে বলে দেবে স্রোতের ওঠাপড়া! তবু অদম্য জেদ নিয়ে সব বাধা অতিক্রম করে তাঁরা এই পথ পাড়ি দিয়েছিলেন।

সূত্র: Science Adviser, 29 December 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − eleven =