কলকাতার বাতাসে বিষ

কলকাতার বাতাসে বিষ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ জানুয়ারী, ২০২৬

কলকাতার দূষিত বাতাসের জন্য সাধারণত কয়লা, গাড়ির ধোঁয়া আর শিল্পকারখানাকেই দায়ী করা হয়। তবে শহরের বায়ু দূষিত হওয়ার পিছনে আরও একটি বড় কারণ রয়েছে। আবর্জনা পোড়ানো। এটি তুলনামূলকভাবে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিক মেশানো আবর্জনা পোড়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। খোলা জায়গায় পোড়ানো প্লাস্টিক থেকে বিষাক্ত ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী গ্যাস বের হয়, যা সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। ‘দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট’ (টিইআরআই) ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। সেই সমীক্ষায় দেখা গেছে, PM10 এবং PM2.5 নামের ক্ষতিকর কণার প্রায় ৫ শতাংশের জন্য দায়ী এই  আবর্জনা পোড়ানো। PM10 ও PM2.5 হল বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র কণা, যা আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরের ভিতরে টেনে নিই। এর মধ্যে PM2.5 সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। কারণ এই কণাগুলি ফুসফুসের গভীরে ঢুকে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে রক্তপ্রবাহেও পৌঁছে যায়। প্রতি বছর শীত এলেই কলকাতার বাতাসের মান দ্রুত খারাপ হতে থাকে। দেখা যাচ্ছে, সকাল ১০টায় ভিক্টোরিয়া এলাকায় বাতাসের মান ছিল ‘খুব খারাপ’। বালিগঞ্জ, বিধাননগর, যাদবপুর এবং বিটি রোডের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিল ‘খারাপ’। ফোর্ট উইলিয়াম ও রবীন্দ্র সরোবরে বাতাসের মান ছিল ‘মাঝারি’। কিন্তু এই ‘মাঝারি’ মানও আসলে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। জাতীয় বায়ু গুণমান সূচক অনুযায়ী, ‘মাঝারি’ স্তরের বাতাসে  অ্যাজমা, হৃদরোগ ও ফুসফুসের সমস্যায় ভোগা মানুষদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। গ্রীষ্ম বা বর্ষাযতেও, দূষণের উৎসগুলি পুরোপুরি বন্ধ হয় না। তবে গরম বাতাস ও বৃষ্টির কারণে দূষণ কিছুটা ছড়িয়ে যায় বা ধুয়ে যায়। শীতকালে বাতাস ঠান্ডা ও ভারী হওয়ায় দূষিত কণাগুলি নীচের দিকেই আটকে থাকে। সেই সঙ্গে বাতাসের গতিও কম থাকে, ফলে দূষণ জমে যায়  শহরের উপরেই। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অনুরোধে করা সমীক্ষায় ধুলো, কয়লা ও বায়োমাসে রান্না, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পদূষণ এবং আবর্জনা পোড়ানো সবকটিকেই কলকাতার দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে PM10-এর ক্ষেত্রে ধুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৩ শতাংশ। তাতে দেখা যাচ্ছে, PM2.5 দূষণের ক্ষেত্রে রাস্তার খাবারের দোকান, গরিব পরিবারের রান্নায় কয়লা বা কাঠের ব্যবহার এবং ইস্ত্রির দোকান মিলিয়ে প্রায় ২৯ শতাংশ দায়ী। শিল্পদূষণের অবদান ২১ শতাংশ এবং গাড়ির ধোঁয়া প্রায় ২০ শতাংশ। কলকাতা মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক অরূপ হালদার বলেন, “PM2.5 কণা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন ধরে এই কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকলে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে গুরুতর সমস্যা হতে পারে। অল্প সময়ের জন্য খুব বেশি দূষণের মধ্যেও শ্বাস নেওয়া ক্ষতিকর”। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের অনুমিতা রায় চৌধুরীর মতে, “এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হল PM2.5-এর উৎস কমানো। শিল্প, যানবাহনের ধোঁয়া এবং আবর্জনা পোড়ানো বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া”।   ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানো, ছোট দোকান ও হকারদের কয়লার উনুনের বদলে বিদ্যুৎচালিত চুলা ব্যবহার করতে উৎসাহ দেওয়া। নির্মাণস্থলে নিয়মিত জল ছিটিয়ে ধুলো কমানো গেলে বাতাসের মান অনেকটাই উন্নত করা সম্ভব হবে বলে ধারণা। তবে কলকাতার বাতাস স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে, দূষণ একটি গভীর বর্তমান সমস্যা। এটি এখনই মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

 

সূত্রঃ Winter air made worse by poison plastic: Open waste burning and its hidden toll on lungs; Times of India; 28th December, 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × four =