আরাবল্লি পর্বতমালার টেকটোনিক বিবর্তন

আরাবল্লি পর্বতমালার টেকটোনিক বিবর্তন

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৩ জানুয়ারী, ২০২৬

আরাবল্লি পর্বতমালা ভারতের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এক প্রাচীনতম ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণি। এটি উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত। এই পর্বতমালা ভারতীয় শিল্ডের একটি অংশ, যা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন স্থলভাগগুলোর মধ্যে অন্যতম। আরাবল্লি পর্বতমালা মূলত দুটি ভৌগোলিক অংশ নিয়ে গঠিত—আরাবল্লি ভাঁজ-বেল্ট এবং দিল্লি ভাঁজ-বেল্ট। এই দুই অংশ মিলিয়ে একে আরাবল্লি–দিল্লি ওরোজেনিক বেল্ট বলা হয়। এখানে “ওরোজেনিক” শব্দের অর্থ হলো—পর্বত গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত অঞ্চল।

ভূ-তত্ত্ববিদদের একটি বড় অংশের মতে, আরাবল্লি পর্বতমালা সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীনতম পর্বতগঠনগুলোর একটি। এর সূচনা প্রোটেরোজোয়িক যুগে, যখন পৃথিবীর ভূত্বক সদ্য স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। এই পর্বতমালার বিকাশ মূলত বুন্দেলখণ্ড ক্রেটন ও মারওয়ার ক্রেটন-এর সংঘর্ষের পরিণাম। কোটি কোটি বছর আগে এই দুটি ভূখণ্ড ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে। অবশেষে যখন তারা ধাক্কা খায়, তখন পৃথিবীর ভূত্বক ভাঁজ হয়ে ওঠে, উঁচু হয়—আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় আরাবল্লির প্রথম রূপ। তবে এর সুনির্দিষ্ট বিবর্তন নিয়ে আজও বৈজ্ঞানিক বিতর্ক অব্যাহত।

 

ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ও স্তরবিন্যাস

আরাবল্লি পর্বতমালার ভূতাত্ত্বিক কাঠামোয় একটি হর্স্ট-সদৃশ রূপ (দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী উঁচু টিলা) দেখা যায়। এতে প্রোটেরোজোয়িক যুগের তীব্রভাবে ভাঁজ-খাওয়া ও রূপান্তরিত শিলার আধিক্য রয়েছে। এই পর্বতমালার স্তরবিন্যাসে তিনটি প্রধান একক চিহ্নিত করা যায়—

  1. আর্কিয়ান যুগের ভিলওয়াড়া নাইসিক কমপ্লেক্স (বি জি সি) – ভিত্তিশিলা
  2. নিম্ন আরাবল্লি সুপারগ্রুপ
  3. উচ্চ দিল্লি সুপারগ্রুপ

পর্বতমালার উত্তরাংশে কেবল দিল্লি সুপারগ্রুপ বিদ্যমান, যা “নর্থ দিল্লি বেল্ট” নামে পরিচিত। দক্ষিণাংশে আরাবল্লি ও দিল্লি—উভয় সুপারগ্রুপই উপস্থিত। সমগ্র পর্বতশ্রেণি পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তীয় ফল্ট দ্বারা সীমাবদ্ধ, যার মধ্যে পূর্ব প্রান্তীয় চ্যুতিটি ‘গ্রেট বাউন্ডারি ফল্ট’ নামে পরিচিত।

 

আর্কিয়ান ভিত্তিশিলা: ভিলওয়াড়া নাইসিক কমপ্লেক্স

প্রায় ২৫০ কোটি বছর পুরোনো ভিলওয়াড়া নাইসিক কমপ্লেক্স এই অঞ্চলের একক প্রাচীনতম শিলা। এতে রয়েছে অ্যাম্ফিবোলাইট থেকে গ্র্যানুলাইট গ্রেডের রূপান্তরিত শিলা, টোনালাইটিক থেকে গ্রানোডায়োরাইটিক নিস এবং গ্রানাইটিক অন্তঃপ্রবেশী শিলা। এই ভিত্তিশিলাকে দুটি অংশে ভাগ করা হয়—স্যান্ডমাতা কমপ্লেক্স (নিস ও গ্রানাইট) এবং মঙ্গলওয়ার কমপ্লেক্স (রূপান্তরিত অবক্ষেপণ ও আগ্নেয় শিলা)। এই ভিত্তিশিলার গঠনই ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাথমিক মহাদেশীয় ভূত্বক তৈরির প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।

 

উদাহরণস্বরূপ, রাজস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম চিত্তৌড়গড় অঞ্চলে অবস্থিত আরাবল্লি পর্বতবলয়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন, শিলাস্তরগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বলা যায়। এই অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলাগঠনগুলোর একটি—যার নাম ব্যান্ডেড নাইসিক কমপ্লেক্স -তার উপর অপেক্ষাকৃত নবীন প্রোটেরোজোয়িক যুগের আরাবল্লি ও বিন্ধ্যন সুপারগ্রুপের শিলাগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। অর্থাৎ ,ব্যান্ডেড নাইসিক কমপ্লেক্স এই অঞ্চলের প্রাচীনতম ভিত্তিশিলা হিসেবে কাজ করেছে। এটি আরাবল্লি ও দিল্লি সুপারগ্রুপের সকল নবীন মেটাসেডিমেন্টারি শিলার নীচে অবস্থান করছে। গুপ্ত (১৯৩৪) ও হেরন (১৯৩৬) প্রথম এই বি জি সি ও বুন্দেলখণ্ড নিস শিলাকে উপরিস্থ রূপান্তরিত পাললিক শিলার ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই ভিত্তিশিলা মূলত আগ্নেয় ও অবক্ষেপণ শিলার মিশ্রণে গঠিত এবং এতে ফেলসিক থেকে মাফিক প্রকৃতির বিভিন্ন অন্তঃপ্রবেশী শিলা বিদ্যমান।

 

আরাবল্লি সুপারগ্রুপ: পর্বতগঠনের প্রথম পর্ব

আর্কিয়ান ভিত্তিশিলার উপর অসমরূপ সংযোগে অবস্থিত আরাবল্লি সুপারগ্রুপ তিনটি ভাগে বিভক্ত—দিলওয়ারা, দেবারি ও ঝারোল গ্রুপ। নিম্ন ও মধ্য গ্রুপে প্রধানত কার্বনেট, কোয়ার্টজাইট ও পেলিটিক শিলা রয়েছে, যা অগভীর সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্মে অবক্ষেপণের ইঙ্গিত দেয়। বিপরীতে, উপরিভাগের ঝারোল গ্রুপে টার্বিডাইট ও কাদামাটিযুক্ত শিলার আধিক্য গভীর সামুদ্রিক পরিবেশের প্রমাণ বহন করে। এই সুপারগ্রুপের অবক্ষেপণকাল আনুমানিক ২.১ থেকে ১.৯ বিলিয়ন বছর।  পরবর্তীকালে একাধিক দফায় ভাঁজ, ছেদনজনিত সমান্তরাল বিকৃতি(শিয়ারিং) , ঢেউ খেলানো গঠন (ক্রেনুলেশন) ও কিঙ্ক ব্যান্ড গঠনের মাধ্যমে এই শিলাগুলো তীব্রভাবে বিকৃত ও রূপান্তরিত হয়। রূপান্তরের মাত্রা গ্রিনশিস্ট থেকে অ্যাম্ফিবোলাইট ফেসিস পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

দিল্লি সুপারগ্রুপ: পর্বত গঠনের দ্বিতীয় পর্ব

আরাবল্লি সুপারগ্রুপের উপর আবারও অসমরূপ সংযোগে অবস্থিত দিল্লি সুপারগ্রুপ, যার অবক্ষেপণকাল আনুমানিক ১.৭ থেকে ১.৫ বিলিয়ন বছর। এতে একদিকে মহাদেশীয় প্রকৃতির ঘন আগ্নেয় শিলা, অন্যদিকে নদী আর অগভীর ও গভীর সামুদ্রিক পরিবেশে গঠিত অবক্ষেপণ শিলা রয়েছে। নর্থ দিল্লি বেল্টে এই সুপারগ্রুপকে রাইলো, আলওয়ার ও আজবগড় গ্রুপে ভাগ করা হয়। দক্ষিণাংশে সমতুল্য শিলাগুলো গোগুন্দা ও কুম্ভলগড় গ্রুপ নামে পরিচিত। এই শিলাগুলোর গঠন আরাবল্লি অঞ্চলে দ্বিতীয় বড় পর্বতগঠনের সাক্ষ্য বহন করে।

 

এই দীর্ঘ যাত্রায় আরাবল্লির জীবনকে চারটি বড় অধ্যায়ে ভাগ করা যায়—

প্রথম অধ্যায়ে, প্রায় ২৫০ কোটি বছর আগে, এই অঞ্চলে গঠিত হয় প্রাচীন ও শক্ত শিলা—যাকে বলা হয় ভিলওয়াড়া নাইসিক কমপ্লেক্স। এটি ছিল আরাবল্লির ভিত্তি।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে, প্রায় ১৮০ কোটি বছর আগে, শুরু হয় প্রথম বড় পর্বত গঠনের পর্ব—আরাবল্লি ওরোজেনি। তখন পাহাড়গুলো ছিল অনেক উঁচু ও শক্তিশালী।

এরপর আসে তৃতীয় অধ্যায়—দিল্লি ওরোজেনি, প্রায় ১১০ কোটি বছর আগে। আবার নতুন করে ভূত্বক ভাঁজ হয়, পাহাড় আরও রূপ পায়।

সবশেষে, প্রায় ৮৫০–৭৫০ মিলিয়ন বছর আগে, ঘটে শেষ পরিবর্তন। ভূত্বক ভাঙে, আবার জোড়া লাগে। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়াকে ভূতত্ত্বে বলা হয় স্যুচারিং—যেন পৃথিবীর ক্ষত সেলাই করা হচ্ছে।

অর্থাৎ,  এই দীর্ঘ সময়ে অঞ্চলটিতে একাধিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে – ভূত্বক ফেটে যাওয়া (রিফটিং), পলি জমা, স্থলভাগের সংঘর্ষ এবং শেষে ভূত্বকের অংশগুলোর জোড়া লাগা (স্যুচারিং)। এসব প্রক্রিয়ার ফলেই আজকের আরাবল্লি পর্বতমালার গঠন তৈরি হয়েছ।

 

পরবর্তী পর্বত গঠনমূলক ঘটনা ও পুরানো অববাহিকা

পর্বতগঠন পর্বের শেষে পশ্চিম আরাবল্লি অঞ্চলে বিশাল আকারের গ্রানাইট ও রাইওলাইটিক আগ্নেয় কার্যকলাপ চলে। এর মধ্যে এরিনপুরা গ্রানাইট ও মালানি আগ্নেয় শিলাসমষ্টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মালানি আগ্নেয় প্রদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম আগ্নেয় প্রদেশগুলোর একটি। এই সময়েই আরাবল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠে অপেক্ষাকৃত অবিকৃত পুরানো অববাহিকা,  যার মধ্যে বিন্ধ্য ও মারওয়ার অববাহিকা প্রধান। বিন্ধ্য অববাহিকা আরাবল্লির দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এবং দীর্ঘ সময় ধরে অগভীর সামুদ্রিক থেকে স্থলজ পরিবেশে পলি সঞ্চয়ের সাক্ষ্যবাহী। অপরদিকে, মারওয়ার অববাহিকা মালানি আগ্নেয় শিলার উপর অবস্থিত এবং ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

মহাদেশ গঠনকারী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক

 

আরাবল্লি পর্বতমালার বিবর্তন কেবল আঞ্চলিক নয়। এটি পৃথিবীর বৃহত্তর পাত-সংস্থানিক (টেকটোনিক) ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। আরাবল্লির পর্বত গঠনের প্রক্রিয়া কলাম্বিয়া সুপারকন্টিনেন্ট গঠনের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।  দিল্লি ওরোজেনি রোডিনিয়া গঠনের পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তী অববাহিকা বিকাশ ও মালানি আগ্নেয় ক্রিয়াকাণ্ড   গন্ডোয়ানা গঠনের পূর্বসূরি ঘটনাগুলোর ইঙ্গিত দেয়।

 

উপসংহার

আরাবল্লি পর্বতমালা তাই শুধু ভারতের নয়, সমগ্র পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। এর শিলায় লেখা আছে পৃথিবীর প্রাচীন মহাদেশ গঠনের গল্প, ভাঙন ও সংঘর্ষের কাহিনি এবং কোটি কোটি বছরের ধীর অথচ গভীর রূপান্তরের সাক্ষ্য। আজ ক্ষয়প্রাপ্ত ও শান্ত এই পাহাড় আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ও নাটকীয় ভূতাত্ত্বিক অভিযাত্রার এক নীরব দলিল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × five =