অ্যামাজনের হুলবিহীন মৌমাছি   

অ্যামাজনের হুলবিহীন মৌমাছি   

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ জানুয়ারী, ২০২৬

অ্যামাজন অরণ্যের গভীর সবুজে বাস করা এক ক্ষুদ্র অপরিহার্য প্রাণ আজ ইতিহাস গড়েছে। হুলবিহীন মৌমাছি বিশ্বে এই প্রথম আইনি অধিকার লাভ করেছে। পেরুর দুটি অঞ্চলে সম্প্রতি গৃহীত একাধিক ঐতিহাসিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই প্রাচীন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কীটপ্রজাতিকে অধিকারসম্পন্ন সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সমর্থকদের আশা, এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারীদের সুরক্ষায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

এই মৌমাছি ইউরোপীয় মধুমাছির মতো হুলযুক্ত নয় এবং প্রাক্-কলম্বিয়ান যুগ থেকেই অ্যামাজনের আদিবাসীরা এগুলো পালন করে আসছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যামাজনের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি পরাগায়ন এই মৌমাছিদের ওপর নির্ভরশীল। কাকাও, কফি ও অ্যাভোকাডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলও এদের মাধ্যমেই টিকে আছে। ফলে বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য ও বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তায় এদের ভূমিকা অপরিসীম।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষচ্ছেদন, কীটনাশক ব্যবহার এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার ‘হন্তারক মৌমাছি’-র সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে এই হুলবিহীন মৌমাছি আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। রাসায়নিক জীববিজ্ঞানী রোসা ভাসকেজ এস্পিনোসা ২০২০ সাল থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে এই মৌমাছি ও তাদের মধু নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। কোভিড মহামারির সময় আদিবাসী চিকিৎসায় ব্যবহৃত মধু বিশ্লেষণ করে তিনি শত শত ঔষধি গুণসম্পন্ন অণু খুঁজে পান—যার মধ্যে অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, প্রদাহনাশক ও এমনকি ক্যানসারবিরোধী উপাদানও রয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর গবেষণায় উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য। দূরবর্তী বনাঞ্চলেও মৌমাছির মধুতে কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায় এবং বহু আদিবাসী জানান, একসময় আধঘণ্টার হাঁটাপথে যেসব মৌমাছি পাওয়া যেত, তাদের এখন খুঁজে পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। বিশেষ করে আফ্রিকান মৌমাছির আগ্রাসনে অনেক এলাকায় হুলবিহীন মৌমাছি কার্যত উৎখাত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে পেরুর সাতিপো ও নাউতা পৌরসভায় গৃহীত অধ্যাদেশগুলো হুলবিহীন মৌমাছিকে দিয়েছে বেঁচে থাকা ও বিকশিত হওয়ার অধিকার, দূষণমুক্ত আবাসস্থল, স্থিতিশীল জলবায়ু এবং আইনি সুরক্ষার অধিকার। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতি হলে মৌমাছির পক্ষ থেকেও আইনি লড়াই সম্ভব হবে।

আদিবাসী আশানিঙ্কা ও কুকামা-কুকামিরিয়া জনগোষ্ঠীর কাছে এই মৌমাছি শুধু খাদ্য বা চিকিৎসার উৎস নয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারও বটে। তাঁদের মতে, এই আইন তাদের জীবনযাপন ও বনভিত্তিক জ্ঞানকে সম্মান দেওয়ার এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে এই উদ্যোগ অনুসরণ করার আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

 

সূত্র: Stingless bees from the Amazon granted legal rights in world first, The Guardian, 29th December 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − 3 =