পৃথিবীর এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে ছোট স্বয়ংক্রিয় রোবট আকারে এতটাই ক্ষুদ্র যে চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু ভবিষ্যতে এই রোবটই মানুষের শরীরের ভিতরে ঢুকে রোগ শনাক্ত করা, ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এমনকি সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারেও সাহায্য করতে পারে। এই মাইক্রো-রোবটগুলির আকার লবণ দানার চেয়েও ছোট। প্রায় ২০০ × ৩০০ × ৫০ মাইক্রোমিটার। গবেষকদের দাবি, এরা অন্যান্য প্রোগ্রামযোগ্য রোবটের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার গুণ ছোট। গত কয়েক দশকে মোবাইল ফোন, সেন্সর বা চিপ প্রভৃতি ইলেকট্রনিক যন্ত্র দ্রুত ক্ষুদ্রতর হয়েছে। কিন্তু রোবটকে ছোট করা অনেক বেশি কঠিন। কারণ রোবট শুধু এক জায়গায় বসে কাজ করে না। তাকে চলাফেরা করতে হয়, পরিবেশ বুঝতে হয় এবং সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক মিসকিন বলেন, “এক মিলিমিটারের চেয়েও ছোট এমন স্বয়ংক্রিয় রোবট বানানো বিজ্ঞানীদের কাছে প্রায় ৪০ বছর ধরে এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল”। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যখন এই রোবটকে তরলের ভিতর চলতে হয়। মানুষের শরীরের ভিতরে রক্ত বা অন্যান্য তরল রয়েছে, যেখানে এই আকারের যেকোনো কিছুর চলাচল খুব কঠিন। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এই পরিবেশে নড়াচড়া করা মানে যেন ঘন আঠার ভিতর দিয়ে নিজেকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া। অথচ বড় রোবটের মতো হাত-পা ব্যবহার করে এগোনো এখানে সম্ভব নয়। এই সমস্যার সমাধানে গবেষকরা অভিনব পথ বেছে নিয়েছেন। রোবট নিজের জোরে নড়ে না, বরং তার চারপাশের তরলই তাকে নড়াচড়া করায়। রোবট একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা তরলের আয়নগুলিকে সরিয়ে দেয়। সেই আয়নগুলি জলকণাকে ধাক্কা দিলে রোবট ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটিয়ে রোবটের দিক ও গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এমনকি একসঙ্গে অনেক রোবটকেও চালানো সম্ভব। এই ক্ষুদ্র রোবটগুলি শক্তি পায় এল ই ডি আলোর ঝলকানি থেকে। খুব কম শক্তি ব্যবহার করে তারা দীর্ঘ সময় ধরে , এমনকি কয়েক মাস একটানা চলতে পারে। রোবটকে কাজে লাগাতে হলে তথ্য সংগ্রহ করতেও হয়। এজন্য দরকার একটি ক্ষুদ্র কম্পিউটার। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড ব্লাউ এবং তাঁর দল এমন একটি মাইক্রো-কম্পিউটার তৈরি করেছেন, যেখানে প্রসেসর, মেমোরি ও সেন্সর মিলিয়ে সবকিছু এক মিলিমিটারেরও কম জায়গায় বসানো হয়েছে। এই সিস্টেম খুব কম শক্তি খরচ করে কাজ করতে পারে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে রোবট শরীরের ভিতরের বিভিন্ন জায়গার তাপমাত্রা মাপতে পারে। তাপমাত্রার সামান্য হেরফের থেকেও কোষের স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা রোগ শনাক্ত করার কাজে লাগতে পারে। এখন গবেষকরা রোবটকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে এতে আরও সেন্সর যোগ করা হতে পারে, চলার গতি বাড়ানো হতে পারে এবং নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের জন্য আলাদা নকশাও তৈরি করা যেতে পারে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিটি রোবট বানাতে খরচ পড়ে মাত্র এক পয়সা। গবেষকদের মতে, এই ক্ষুদ্র রোবট প্রযুক্তি এখনো শুরুর পর্যায়ে। তবে এর সম্ভাবনা অনেক বড়। আকারে অতি ছোট হলেও, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের ভবিষ্যতে এই রোবটগুলো বড় ভূমিকা নিতে পারে।
