প্রয়াত জনগণের বিজ্ঞানী মাধব গাডগিল

প্রয়াত জনগণের বিজ্ঞানী মাধব গাডগিল

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১০ জানুয়ারী, ২০২৬

বিদ্যুৎ চাই। উন্নয়ন চাই। শিল্পায়ন চাই। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- এর দাম কে দেবে? এই প্রশ্নই ছোটবেলা থেকে কুরে খেয়েছে মাধব গাডগিলকে। ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবেশবিদ,পশ্চিমঘাট রক্ষার মুখ, আর ‘জনগণের বিজ্ঞানী’ হিসেবে পরিচিত মানুষটির ভাবনার বীজ রোপণ হয়েছিল বহু আগেই। মহারাষ্ট্রের এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশে দাঁড়িয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন অর্থনীতিবিদ্‌ ও রাষ্ট্রনায়ক। একদিন ছোট মাধবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘুরতে গিয়েছিলেন একটি ‘হাইড্রো-ইলেকট্রিক’ প্রকল্পে। চারপাশে তখন নির্বিচারে গাছ কাটা চলছে। পাহাড়ের গায়ে ক্ষত। নদীর গতিপথ বদলাচ্ছে। সেদিন বাবার মুখে শোনা প্রশ্নটা মাধব গাডগিল ভুলতে পারেননি। “বিদ্যুৎ দরকার, উন্নয়ন দরকার। কিন্তু তার বিনিময়ে কি পরিবেশ ধ্বংস আর স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ মেনে নেওয়া যায়?” এই এক বাক্যই যথেষ্ট ছিল গাডগিলের জন্য। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আর প্রান্তিক মানুষের প্রতি সহানুভূতি- দুই মেরু একসঙ্গে গেঁথে গিয়েছিল তাঁর চিন্তায়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অলিগলি থেকে শুরু করে ভারতের ক্ষমতার অলিন্দ, ছয় দশকের গবেষণা জীবনে মাধব গাডগিল হেঁটেছিলেন এক ব্যতিক্রমী পথে। তিনি কখনও নিজেকে কেবল গবেষণাগারের বিজ্ঞানী ভাবেননি। বরং নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন ‘জনগণের বিজ্ঞানী’ হিসাবে। তাঁর কাছে বিজ্ঞান মানে শুধু জার্নালে প্রকাশিত কিছু পেপার নয়। বিজ্ঞান মানে গ্রামবাসীর জীবনে বদল। বনবাসীর অধিকারের স্বীকৃতি। জেলের জালে ধরা পড়া মাছের ভবিষ্যৎ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আলাদা করে দিয়েছিল। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে দীর্ঘদিন কাজ করার সময় তিনি গড়ে তুলেছিলেন সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল সায়েন্সেস। যা শুধু গবেষণার কেন্দ্র নয়, হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি।

ভারতের পশ্চিমঘাট বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ অঞ্চল। একই সঙ্গে খনি, বাঁধ, পাথর খাদান আর রাস্তাঘাটের চাপে জর্জরিত এক ভূখণ্ড। ১৯৮৬ সালে গাডগিলের নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে ভারতের প্রথম বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। নাম হয়, নীলগিরি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। তিনটি রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল আজ ভারতের সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত এলাকা। এই সাফল্য এসেছিল মাঠে নেমে কাজ করার মাধ্যমেই। গাডগিল শুধু মানচিত্র আর উপগ্রহচিত্র দেখেননি। হেঁটেছেন বনপথে। থেকেছেন আদিবাসী গ্রামে। শুনেছেন বনদেবীর গল্প, পবিত্র অরণ্যের লোককথা। তাঁর কাছে সংরক্ষণ মানে কেবল “মানুষের প্রবেশ বন্ধের” নীতি ছিল না। বরং ছিল, মানুষকে সঙ্গে নিয়েই বনকে রক্ষা করার বাস্তব উদ্যোগ।

গাডগিল শুধু গবেষক নন, তিনি নীতিনির্ধারকও। প্রধানমন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা পরিষদসহ একাধিক সরকারি কমিটিতে থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ আইন তৈরিতে অবদান রেখেছেন। ভারতের ‘বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি অ্যাক্ট’ ও ‘ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট’-এই দুই আইনের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর চিন্তার ছাপ। এই আইনগুলোর মাধ্যমেই গ্রামবাসীরা তৈরি করতে পেরেছেন বায়োডাইভার্সিটি রেজিস্টার। যা ঐ এলাকার বন, মাছ, ফল, উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্যের জীবন্ত নথি। এর ফল কী? মহারাষ্ট্রের এক গ্রামে দেখা যায়, নদীতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছাড়ার ফলে মাছ মরে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ সেই তথ্য নথিভুক্ত করে। আশপাশের গ্রাম একজোট হয়ে রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ধীরে ধীরে নদী ফিরে পায় তার প্রাণ। কোথাও আবার এই নথির জোরেই আদালতে গিয়ে পাথর খাদানের বিরুদ্ধে লড়াই জিতেছে গ্রামবাসীরা। গাডগিল বলেন, “অনেক গ্রামে ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। এটা দেখলে সত্যিই আশার আলো জ্বলে ওঠে।”

২০০৬ সালে ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পান মাধব গাডগিল। ২০০৭ সালে, পরিবেশ ও সমাজে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় এইচ. কে. ফিরোদিয়া পুরস্কার। ২০১১ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অনুরোধে গঠিত হয় ‘ওয়েস্টার্ন ঘাটস ইকোলজি এক্সপার্টস প্যানেল’। চেয়ারম্যান মাধব গাডগিল। ২০১৩ সালে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অফ ওড়িশা তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অফ সায়েন্স’ ডিগ্রি দেয়। ২০১৪ সালে পশ্চিমঘাট ইকোলজি এক্সপার্টস প্যানেল এবং তার চেয়ারম্যান হিসেবে গাডগিলের অবদানকে স্বীকৃতি জানায়। দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (TERI) তাঁকে দেয় ‘জর্জেস্কু–রোগেন অ্যাওয়ার্ড’। এই প্যানেলের রিপোর্ট, আজ ‘গাডগিল রিপোর্ট’ নামে প্রসিদ্ধ। রিপোর্টে বলা হয়, পশ্চিমঘাটের বড় অংশকে ‘ বাস্তু সংবেদী এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু তাকে হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও মানুষকেন্দ্রিক। রিপোর্ট প্রকাশের পর শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। শিল্পমহলের চাপ। রাজনৈতিক অস্বস্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রিপোর্টই হয়ে ওঠে ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’। ইউনেস্কো ও আইইউসিএন, পশ্চিমঘাটকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ ঘোষণার সময় এই রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। ২০১৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণে আজীবন অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া তাঁকে প্রদান করে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘জন ও অ্যালিস টাইলার প্রাইজ ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যাচিভমেন্ট’। এই পুরস্কার তিনি যৌথভাবে পান ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেন লুবচেঙ্কোর সঙ্গে। এর মাধ্যমে মাধব গাডগিল হয়ে ওঠেন এম. এস. স্বামীনাথনের পর টাইলার পুরস্কার প্রাপ্ত দ্বিতীয় ভারতীয়। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন বিক্রম সারাভাই পুরস্কার ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পুরস্কার। ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি, নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফার্গুসন কলেজ থেকে কৃতী প্রাক্তনী হিসেবে পান ‘ফার্গুসন গৌরব পুরস্কার’। আর ২০২৪ সালে, পরিবেশ রক্ষায় আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, রাষ্ট্র সংঘ তাঁকে তাদের সর্বোচ্চ পরিবেশ সম্মান— ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ’ দেয় তাঁর আজীবন অবদানের জন্য। ইউএনইপি প্রধান ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, “মাধব গাডগিল দেখিয়েছেন, বিজ্ঞান কীভাবে প্রকৃতি রক্ষা করতে পারে, মানুষকে সম্মান জানিয়ে,তাদের সাথে নিয়ে।”এই সালেই কেরালায় ভয়াবহ ভূমিধসে ২০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু যেন আবারও প্রমাণ করে দেয়, গাডগিল ভুল বলেননি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র বৃষ্টি, সঙ্গে পাহাড় কাটা আর বন উজাড় সব মিলিয়েই এই বিপর্যয়।

আশির কোঠায় পৌঁছেও গাডগিল থামেননি। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে তরুণদের শিখিয়েছেন, নিজেদের বনাধিকার কীভাবে বুঝতে হয়। কীভাবে স্মার্টফোন দিয়ে গাছের ছবি তুলে প্রজাতি চিহ্নিত করা যায়। সেই সূত্রেই এক কিশোরের তোলা ছবি দেখে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন এক বিরল জাতির অর্কিড। সেই গবেষণাপত্রে সহলেখক হিসেবে জায়গা করে নেয় সেই গ্রাম্য কিশোরও। গাডগিল হাসতে হাসতে বলেন, “প্রযুক্তি আর মুক্ত জ্ঞান মানুষকে আরও শক্তিশালী করবে। সেটাই আমাদের আশা।“ নিজের সম্পর্কে গাডগিল বলতেন, তিনি হলেন “টেকসই আশাবাদী”। ভারত যখন জলবায়ু সংকট, ভূমিক্ষয় আর জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মুখে দাঁড়িয়ে, তখন গাডগিলের বার্তা পরিষ্কার: উন্নয়ন বনাম পরিবেশ—এই লড়াই মিথ্যা।

আসল লড়াই হলো, কে সিদ্ধান্ত নেবে? মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের অধিকার স্বীকার করে, প্রকৃতির ভাষা বুঝে এগোলে, উন্নয়নও হবে, সংরক্ষণও হবে। পশ্চিমঘাটের পাহাড়ে আজও যখন মেঘ নামে, অরণ্যের গভীর থেকে ভেসে আসে জীবনের শব্দ, সেই শব্দের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকেন এক বিজ্ঞানী, যিনি কখনও ক্ষমতার পক্ষে নয়, বরাবর মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। প্রকৃতির পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই ‘জনগণের বিজ্ঞানী’ মাধব গাডগিল ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ পুণেতে নিজ বাসভবনে প্রয়াত হলেন। বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। রেখে গেলেন অবিস্মরণীয় এক ঐতিহ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + 19 =