বৃদ্ধ কার্টিলেজকে নবযৌবন দান

বৃদ্ধ কার্টিলেজকে নবযৌবন দান

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬

বয়স বাড়লে হাঁটুর ব্যথা যেন অবধারিত। কার্টিলেজ ক্ষয়ে যাবে, গাঁট ফুলবে, ব্যথা বাড়বে, শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম হাঁটু বসাতে হবে —এটাই বাস্তব। কিন্তু স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িত একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের ক্রিয়া বন্ধ করতে পারলে বয়স্ক হাঁটুতেও নতুন করে কার্টিলেজ গজাতে পারে। গবেষণাটি হয়েছে ইঁদুরের উপর। কিন্তু ফলাফল মানুষের জন্যও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শুধু কার্টিলেজ নতুন করে গজানোই নয়, এই চিকিৎসা হাঁটুর গুরুতর আঘাত, যেমন- লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পর যে বাত তৈরি হয়, সেটিকেও কার্যত আটকে দিতে পেরেছে। বর্তমানে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের এমন কোনও ওষুধ নেই যা রোগের মূলে ইতি টানতে পারে। চিকিৎসা মানেই ব্যথানাশক, ফিজিওথেরাপি, আর শেষ ধাপে জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট। অথচ এই রোগে ভোগেন প্রায় প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন। শুধু আমেরিকাতেই এর চিকিৎসা খরচ বছরে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা একেবারে শিকড়ে গিয়ে 15-PGDH নামে একটি প্রোটিনকে চিহ্নিত করেছেন। এটি এক ধরনের ‘জেরোজাইম’। অর্থাৎ যেসব উৎসেচক বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বেড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে কোষকলার কাজ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই জেরোজাইমের ধারণাটিও প্রথম সামনে আনে এই একই গবেষক দল, ২০২৩ সালে। ইঁদুরে দেখা গিয়েছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে 15-PGDH বেড়ে গেলে পেশির শক্তি কমে যায়। উল্টো দিকে, এই প্রোটিনের কাজ বন্ধ করে দিলে বয়স্ক ইঁদুরের পেশি আবার শক্তিশালী হয়। এখন দেখা গেল, কার্টিলেজের ক্ষেত্রেও সেই একই গল্প। গবেষকেরা প্রথমে অনুসন্ধান করলেন, তরুণ আর বয়স্ক ইঁদুরের হাঁটুর কার্টিলেজে 15-PGDH-এর মাত্রা কতটা আলাদা।ফল স্পষ্ট। বয়স্ক ইঁদুরে এই প্রোটিনের মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ। এরপর তাঁরা বয়স্ক ইঁদুরদের শরীরে একটি ছোট অণুর ওষুধ দেন, যা 15-PGDH-এর কাজ বন্ধ করে দেয়। কখনও গোটা শরীরে কাজ করার জন্য পেটে ইনজেকশন, কখনও সরাসরি হাঁটুতে। দুই ক্ষেত্রেই ফল এক। যে কার্টিলেজ বয়সের সঙ্গে পাতলা ও দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, তা আবার পুরু হতে শুরু করে এবং জয়েন্টের উপর সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নতুন কার্টিলেজটি ছিল হায়ালিন কার্টিলেজ। অর্থাৎ ঠিক একই ধরনের মসৃণ, চকচকে কার্টিলেজ যা সুস্থ হাঁটুতে থাকে। এ কোনও নিম্নমানের বিকল্প নয়। অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ নিধি ভুটানি বলছেন, “বয়স্ক ইঁদুরে কার্টিলেজের পুনর্গঠন যে এতটা হবে, তা আমরা ভাবিনি। প্রভাবটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো।”

খেলাধূলায় লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু অস্ত্রোপচার করালেও প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ ১০–১৫ বছরের মধ্যে সেই হাঁটুতে অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হন। গবেষকেরা হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া সদৃশ আঘাতপ্রাপ্ত ইঁদুরদের চার সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে দু’বার করে 15-PGDH স্তিমিত করার ইনজেকশন দেন। ফল? যাদের ওষুধ দেওয়া হয়নি তারা দ্রুত আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হয়। আর যাদের দেওয়া হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে রোগ কার্যত দেখা যায়নি, হাঁটার ধরনও ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। এখানেই এই গবেষণার সবচেয়ে বড় চমক। এতদিন কোষকলা পুনর্গঠনের কথা উঠলেই স্টেম সেলের কথা ভাবা হতো। কিন্তু কার্টিলেজের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। গবেষণাদলের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী হেলেন ব্লাউ বলছেন, “আমরা ভেবেছিলাম এক্ষেত্রে শুধু স্টেম সেল জড়িত থাকবে। কিন্তু দেখা গেল, পুরনো কন্ড্রোসাইট কোষই নিজেদের জিনের কাজ বদলে ফেলে আবার তরুণের মতো আচরণ করছে।“ অর্থাৎ, কোষ বদলায়নি, কোষের ‘প্রোগ্রাম’ বদলেছে। ইঁদুরে এই সাফল্যের পর গবেষকেরা হাঁটু প্রতিস্থাপনের সময় মানুষের শরীর থেকে বের করা কার্টিলেজ নিয়ে পরীক্ষা করেন। এক সপ্তাহ 15-PGDH স্তিমিতকারী ওষুধ দেওয়ার পর দেখা গেল, কার্টিলেজ ক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত জিনগুলির সক্রিয়তা কমেছে, আর সুস্থ আর্টিকুলার কার্টিলেজ তৈরির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এটা স্পষ্ট ইঙ্গিত যে এই পদ্ধতি মানুষের শরীরেও কাজ করতে পারে। এই একই ওষুধের ট্যাবলেট সংস্করণ ইতিমধ্যেই বার্ধক্যজনিত পেশি দুর্বলতার জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে, এবং প্রাথমিকভাবে নিরাপদ বলেই ধরা পড়েছে। ব্লাউ বলছেন, “ভাবুন তো, নিজের শরীরেই নতুন করে কার্টিলেজ গজাচ্ছে, আর জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্টের দরকারই পড়ছে না।“ এখনও অবশ্য মানুষের উপর বড় আকারের পরীক্ষা বাকি। কিন্তু যদি এই পন্থা সফল হয়, তাহলে হাঁটুর ব্যথা আর বার্ধক্য আদৌ সমার্থক থাকবে না। ক্ষয় মানেই শেষ, এই ধারণাটা এবার বদলে যেতে পারে।

 

সূত্র: Inhibition of 15-hydroxy prostaglandin dehydrogenase promotes cartilage regeneration” by Mamta Singla, Nidhi Bhutani, et.el November 2025, Science.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five + nineteen =