ওজন কমানোর ওষুধের দৌড় কদ্দূর? 

ওজন কমানোর ওষুধের দৌড় কদ্দূর? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওজন কমানোর জন্য GLP-1 ইনজেকশন বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই GLP-1/গ্লুকাগন সদৃশ পেপটাইড-1 হল মানব অন্ত্র থেকে নিঃসৃত একপ্রকার প্রাকৃতিক হরমোন। এর কাজ হল রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষা করা । এর অনুকরণে তৈরি ওষুধগুলো ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এর প্রধান কাজই হল অগ্ন্যাশয়কে বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে উদ্দীপিত করা (যখন রক্তে শর্করা বেশি থাকে) এবং পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেওয়া। ফলে পেট ভরা ভরা লাগে ও রক্তে শর্করা ধীরে ধীরে বাড়ে। অনেকে মনে করছেন, এই আধুনিক ওষুধই বুঝি স্থূলতার চূড়ান্ত সমাধান। কিন্তু বাস্তব জীবনের বৃহত্তর পরিসরের নতুন গবেষণা অন্য কথা বলছে। ওজন কমানোর লড়াইয়ে ওষুধ নয়, সার্জারিই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। ঐ ওষুধগুলোর তুলনায় ওজন কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি যা ওজন কমাতে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী ফল দেয়।

আমেরিকান সোসাইটি ফর মেটাবলিক অ্যান্ড ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি (এ এস এম বি এস)-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উপস্থাপিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে এন ওয়াই ইউ ল্যাঙ্গোন হেলথ এবং এন ওয়াই সি হেলথ প্লাস হসপিটালস-এর গবেষক দল। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চিকিৎসা নেওয়া ৫০,০০০-এরও বেশি রোগীর বাস্তব তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের BMI ৩৫ বা তার বেশি, এবং তথ্য বিশ্লেষণে বয়স, প্রাথমিক ওজন ও অন্যান্য রোগ প্রভৃতি বিষয়কে সমন্বিত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, যারা স্লিভ গ্যাস্ট্রেকটমি বা গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারি করিয়েছেন, তারা দুই বছরে গড়ে ৫৮ পাউন্ড ওজন কমিয়েছেন, যা শরীরের মোট ওজনের প্রায় ২৪ শতাংশ। বিপরীতে, অন্তত ছয় মাস ধরে ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারকারী রোগীরা গড়ে মাত্র ১২ পাউন্ড ওজন কমিয়েছেন—যা মোট ওজনের ৪.৭ শতাংশ। এমনকি যারা একটানা এক বছর GLP-1 ওষুধ নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও গড় ওজন কমার হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ, যা সার্জারির ফলাফলের তুলনায় অনেক কম।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেখানে GLP-1 ওষুধে ১৫–২১ শতাংশ ওজন কমার কথা বলা হয়, বাস্তবে তা এত কম কেন? গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো বাস্তব জীবনের বাধা—বমি ভাব, পেটের সমস্যা, দীর্ঘদিন নিয়ম মেনে ইনজেকশন নেওয়ার কষ্ট এবং সবচেয়ে বড় বিষয়, প্রচুর খরচ। তথ্য বলছে, প্রায় ৭০ শতাংশ রোগী এক বছরের মধ্যেই এই ওষুধ বন্ধ করে দেন, আর দুই বছরে সেই হার বেড়ে যায় ৭২ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে, ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি একবার করালে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। শুধু ওজনই কমে না, অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ ও সার্জারি—দুটোরই নিজস্ব ভূমিকা আছে। যদিও ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি এখনও যথেষ্ট ব্যাপকহারে প্রচলিত হয় নি, তবুও যারা ওষুধে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না, বা খরচ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সমস্যায় পড়ছেন, তাদের জন্য এই সার্জারি হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত,কার্যকর ও টেকসই সমাধান। ভবিষ্যতে কোন রোগীর জন্য ওষুধ ভালো, আর কার জন্য সার্জারি উপযুক্ত—তা নির্ধারণ করাই হবে পরবর্তী গবেষণার লক্ষ্য।

 

সূত্র : This weight loss option beats Ozempic by 5 times. Materials provided by American Society for Metabolic and Bariatric Surgery, 7th January 2026. <www.sciencedaily.com/releases/2026/01/260106224639.htm>.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + 17 =