ঘুমই জানাবে রোগের ইশারা

ঘুমই জানাবে রোগের ইশারা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬

এক রাত ঠিকমতো ঘুম না হলে সাধারণত পরদিন ক্লান্তি আসে।স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই এক রাতের ঘুমের ব্যাঘাতেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভবিষ্যতের রোগের সংকেত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এখন এক রাতের ঘুম বিশ্লেষণ করেই আন্দাজ করা সম্ভব, আগামী দিনে কার শরীরে কোন অসুখ বাসা বাঁধতে পারে। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন ও তাদের সহযোগী গবেষকেরা তৈরি করেছেন এক অভিনব এ.আই ব্যবস্থা ‘স্লিপ এফএম’। এই সিস্টেম এক রাতের ঘুমের শারীরিক সংকেত বিশ্লেষণ করে ১০০-রও বেশি রোগের ঝুঁকি অনুমান করতে পারে। এই এ.আই প্রশিক্ষিত হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের ৫ লক্ষ ৮৫ হাজার ঘণ্টার ঘুমের তথ্য দিয়ে। তথ্য এসেছে ‘পলি সমনোগ্রাফি’ পরীক্ষার মাধ্যমে, যাকে ঘুম পরীক্ষার ‘স্বর্ণমান’বলা হয়। এই পরীক্ষায় ঘুমের সময় মস্তিষ্কের তরঙ্গ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, চোখের নড়াচড়া, পায়ের গতি সবই একসঙ্গে ধরা পড়ে। সাধারণত ল্যাবরেটরিতে রাতভর এই পরীক্ষা করা হয়। তবে এতদিন ঘুমজনিত রোগ নির্ণয়েই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এই পরীক্ষার ভিতরেই লুকিয়ে আছে অনেক গভীর শারীরবৃত্তীয় তথ্য। স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমানুয়েল মিনিও বলছেন, “একজন মানুষ আট ঘণ্টা ধরে কার্যত আমাদের পর্যবেক্ষণে থাকে। এই সময়ে বিপুল পরিমাণ শারীরিক তথ্য সংগৃহীত হয়, যার বেশিরভাগ এতদিন বিশ্লেষণই করা হয়নি।“ এই জায়গাতেই এ.আই চিত্র পাল্টে দেয়। গবেষকেরা তৈরি করেন একটি ‘ফাউন্ডেশন মডেল’। যেমন বড় ভাষা মডেল, লেখা ভাষা শেখে, তেমনই স্লিপ এফএম শিখে নেয় ‘ঘুমের ভাষা’। প্রতিটি ঘুমের রেকর্ডকে পাঁচ সেকেন্ডের ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়, শব্দের মতোই। মস্তিষ্ক, হৃদয়, পেশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের সংকেত মিলিয়ে এআই বুঝে ফেলে শরীরের রাতের কথোপকথন। প্রথমে স্লিপ এফএম ব্যবহার করা হয় সাধারণ ঘুম বিশ্লেষণে। ঘুমের স্তর শনাক্ত করা, ঘুমের সময় শ্বাসকষ্টর তীব্রতা মাপা ইত্যাদির জন্য। ফল ছিল চমকপ্রদ। বিদ্যমান সেরা মডেলগুলোরই সমান বা অনেক ক্ষেত্রে আরও ভালো। এরপর গবেষকেরা আরও বড় প্রশ্ন তোলেন, ঘুম কি ভবিষ্যতের রোগের পূর্বাভাস দিতে পারে? এজন্য ঘুমের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয় কয়েক দশকের চিকিৎসা ইতিহাস। স্ট্যানফোর্ড স্লিপ মেডিসিন সেন্টারের কাছে ২৫ বছর পর্যন্ত অনুসৃত রোগীদের তথ্য থাকায় এই বিশ্লেষণ সম্ভব হয়। শুধু ঘুমের তথ্য ব্যবহার করেই স্লিপ এফএম ১৩০টি রোগের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পেরেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসার, হৃদরোগ, মানসিক অসুখ, গর্ভাবস্থার জটিলতা এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও। পার্কিনসন্স, ডিমেনশিয়া, হার্ট অ্যাটাক, প্রোস্টেট ও স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে নির্ভুলতার হার ছিল ৮০ শতাংশেরও বেশি।

 

এই নির্ভুলতা মাপা হয় C-index দিয়ে। যা দেখায়, দুই ব্যক্তির মধ্যে কে আগে অসুস্থ হবে, তা এআই কতটা ঠিকভাবে অনুমান করতে পারছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেখানে ০.৭ স্কোরের মডেলও ব্যবহৃত হয়, সেখানে স্লিপ এফএম-এর ০.৮ বা তার বেশি স্কোর যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। একটি অঙ্গ নয়, সব সংকেত একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই ভবিষ্যদ্বাণী সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। “যখন মস্তিষ্ক ঘুমোচ্ছে কিন্তু হৃদয় জেগে আছে এই অসামঞ্জস্যই বিপদের ইঙ্গিত দেয়”, বলছেন মিনিও। ভবিষ্যতে গবেষকেরা স্লিপ এফএম-কে আরও ব্যাখ্যাযোগ্য করতে চান। এর সঙ্গে স্মার্ট ওয়াচ বা পরিধানযোগ্য যন্ত্রকৌশলের তথ্য যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতদিন রাতের ঘুম ছিল শুধু বিশ্রামের সময়। এখন তা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য রিপোর্ট। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সেই সংকেত শুনতে প্রস্তুত?

 

সূত্র : A multimodal sleep foundation model for disease prediction. Nature Medicine, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five + 11 =