প্রবালপ্রাচীরের অদৃশ্য দৈনিক ছন্দ 

প্রবালপ্রাচীরের অদৃশ্য দৈনিক ছন্দ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জানুয়ারী, ২০২৬

সমুদ্রের গভীরে প্রবালপ্রাচীর এক জীবন্ত নগরী। যেখানে রঙিন মাছের ভিড়, প্রবালের স্থির সৌন্দর্য আর আলো-ছায়ার খেলা চলে। কিন্তু এই দৃশ্যমান জীবনের আড়ালে চলছে আরও সূক্ষ্ম, আরও রহস্যময় এক ছন্দ। সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে, প্রবালপ্রাচীর তার চারপাশের জলে থাকা অদৃশ্য অণুজীব জগতকেও ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিয়ন্ত্রণ করে।

ইজরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রবালপ্রাচীরের ওপরের জলে ব্যাকটেরিয়া, ক্ষুদ্র শৈবাল ও অণুবীক্ষণিক শিকারিদের সংখ্যা ও গঠনে পরিবর্তন ঘটে। এই দ্রুত পরিবর্তন ধরতে বিজ্ঞানীরা ছয় ঘণ্টা অন্তর জলের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং জিনগত বিশ্লেষণ, ফ্লো সাইটোমেট্রি, উন্নত ইমেজিং ও জৈব-রাসায়নিক পদ্ধতির সাহায্যে অণুজীব সংখ্যার সূক্ষ্ম ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা গেছে, কোনো অণুজীবের সংখ্যা দিনে কম রাতে বেশি আবার কোনোটা রাতে কম দিনে বেশি।

গবেষণাটি লোহিত সাগরের উত্তর অংশে আকাবা উপসাগরের একটি প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলে পরিচালিত হয়। সেখানে শীত ও গ্রীষ্ম—দু’টি ঋতুতেই প্রবালপ্রাচীরের জলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে পাশের খোলা সমুদ্রের জলের। ফলাফল থেকে দেখা যায়, প্রবালপ্রাচীরের ওপরের জলে ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক শৈবালের সংখ্যা খোলা সমুদ্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর অর্থ, প্রবালকীটেরা শুধু আশ্রয়ই দেয় না তারা সক্রিয়ভাবে এই অণুজীবদের খেয়ে বা অপসারণ করে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

আবার, রাত নামলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। তখন হেটেরোট্রফিক প্রোটিস্ট নামের ক্ষুদ্র শিকারি অণুজীবের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়, কখনও কখনও প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। এটি ইঙ্গিত দেয় যে শিকার ও খাদ্যজালের প্রক্রিয়াই এই দৈনিক অণুজীবীয় ছন্দের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। অন্ধকারে চলা এই শিকারপ্রক্রিয়া অণুজীব সমাজকে নতুন করে সাজিয়ে তোলে।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিমবায়োডিনিয়াসি নামক ডাইনোফ্লাজেলেট (এককোষী জীব) গোষ্ঠী। এরা প্রবালের সঙ্গে সহাবস্থানে থাকা অণুজীব হিসেবে পরিচিত। এদের জিনগত উপস্থিতি প্রায়ই দুপুরের আলোয় সর্বোচ্চ হয়। গবেষকদের ধারণা, সূর্যালোক, প্রবালের বিপাকক্রিয়া এবং অণুজীবের মুক্তি বা পুনর্নবীকরণের সঙ্গে এই ছন্দ গভীরভাবে জড়িত। এই দৈনিক অণুজীবীয় ছন্দ অনেক সময় ঋতু পরিবর্তনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। তাই প্রবালপ্রাচীর কতটা সুস্থ, কতটা সক্রিয়—তা বোঝার জন্য দিনের সময় ভবিষ্যতে এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে। পরিবর্তনশীল জলবায়ুর যুগে, প্রবালপ্রাচীরের এই নীরব সময়চক্র আমাদের সমুদ্র তথা সামুদ্রিক জীব রক্ষার নতুন দিশা দেখাতে পারে।

 

সূত্র: Coral reefs have a hidden daily rhythm scientists just discovered, Materials provided by The Hebrew University of Jerusalem, 9th January 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six + nine =