নবজাতকের ডায়াবেটিস সৃষ্টিকারী জিন

নবজাতকের ডায়াবেটিস সৃষ্টিকারী জিন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ জানুয়ারী, ২০২৬

এতদিন জানা ছিল খাবারে অতিরিক্ত চিনি, অলসতা, বয়সের ভার আর ইনসুলিন হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় একটা নির্দিষ্ট বয়েসের পর মূলত প্রাপ্তবয়স্কদেরই ডায়াবেটিস রোগটা হয়। কিন্তু যখন এই রোগ জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই একটি শিশুকে গ্রাস করে, তখন সেই ধারণা ভেঙে পড়ে। প্রশ্ন উঠে আসে—এত অল্প বয়সে শরীর কীভাবে ইনসুলিন উৎপাদনে ব্যর্থ হয়? বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই এতটুকু জানতেন যে নবজাতকদের ডায়াবেটিসের পেছনে জিনগত কারণ থাকতে পারে, কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। এবার সেই রহস্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্মোচন করলেন গবেষকরা।

ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার মেডিক্যাল স্কুলের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নবজাতকের ডায়াবেটিসের এক নতুন, বিরল এবং সম্পূর্ন অচেনা রূপ চিহ্নিত করেছেন। এই রোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র জিন—TMEM167A। এই জিনে ত্রুটি থাকলে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়, আর শিশুর শরীর জন্মের শুরুতেই বিপাকীয় সংকটে পড়ে।

গবেষণাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে শুধু ডায়াবেটিস নয়, একই সঙ্গে স্নায়বিক জটিলতার কথাও উঠে এসেছে। গবেষকরা এমন ছটি শিশুকে পরীক্ষা করেন, যাদের জন্মের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। এবং এই ছয়জন শিশুর প্রত্যেকেরই ডায়াবেটিসের পাশাপাশি মৃগী (এপিলেপ্সি), মস্তিষ্কের অপূর্ণ বিকাশ বা অতি ছোট মাথা (মাইক্রোসেফালি) প্রভৃতি সমস্যা ছিল। জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সব উপসর্গের পেছনে একটি মাত্র কারণই দায়ী – TMEM167A জিনের পরিবর্তন। ফলে স্পষ্ট হয়, বিপাকীয় রোগ ও স্নায়ুরোগের মধ্যে সম্পর্ক নিছক কাকতালীয় নয়; বরং তারা একই জৈবিক দুর্বলতার ভিন্ন প্রকাশ।

এই জিনটি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক স্টেম সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। গবেষকরা মানব স্টেম সেল থেকে ইনসুলিন উৎপাদক বিটা কোষ তৈরি করেন। এরপর CRISPR নামের জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি দিয়ে TMEM167A জিনটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। দেখা গেছে এই জিন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোষের ভেতরে তীব্র চাপ তৈরি হয়, আত্মরক্ষামূলক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয় এবং শেষ পর্যন্ত কোষগুলো আত্মবিনাশের পথে হাঁটে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় এবং ডায়াবেটিস দেখা দেয়। অর্থাৎ, ডায়াবেটিস এখানে বয়স বাড়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে আসা রোগ নয়; এটি কোষ ধ্বংসের সরাসরি পরিণতি।

গবেষকরা জানান, TMEM167A জিনটি শুধু ইনসুলিন উৎপাদনের জন্য নয়, স্নায়ুকোষের সুস্থ কাজের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ শরীরের বহু অন্য কোষ এই জিন ছাড়াও টিকে থাকতে পারে—এ কারণেই রোগটির লক্ষণ এত নির্দিষ্ট ও মারাত্মক।

এই গবেষণার গুরুত্ব কেবল একটি বিরল রোগ শনাক্ত করায় সীমাবদ্ধ নয়। ডায়াবেটিসের মতো বহুল পরিচিত রোগের শিকড় অনেক গভীরে, অনেক সূক্ষ্ম জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রোথিত। আজ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ কোটির কাছাকাছি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাই একটি ছোট জিনের ভূমিকা বোঝা ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বড় বার্তা বহন করে।

নবজাতকের ডায়াবেটিসের এই নতুন ব্যাখ্যা চিকিৎসাবিদ্যাকে শুধু অতীতের অন্ধকার কোণ আলোকিত করতে সাহায্য করছে না; ভবিষ্যতের নির্ভুল চিকিৎসা ও জিনভিত্তিক থেরাপির দিকেও দৃষ্টি ফেরাচ্ছে। লক্ষ্য এখন একটাই—এই জ্ঞানকে কত দ্রুত আমরা রোগীর উপকারে লাগাতে পারব।

 

সূত্র: Recessive TMEM167A variants cause neonatal diabetes, microcephaly, and epilepsy syndrome by Enrico Virgilio, Sylvia Tielens. Materials provided by University of Exeter. Published in Journal of Clinical Investigation, 2025; 135 (22) DOI: 10.1172/JCI195756

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 17 =