অরণ্যচ্ছেদন ও মশার রক্ত পিপাসা

অরণ্যচ্ছেদন ও মশার রক্ত পিপাসা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬

বনাঞ্চল ধ্বংসকে আমরা সাধারণত জীববৈচিত্র্য বা জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষিতে দেখি। কিন্তু অরণ্য ধ্বংস হলে শুধু গাছপালা বা বন্যপ্রাণীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বদলে যায় রোগের গতিপ্রকৃতিও। ব্রাজিলের আটলান্টিক অরণ্য নিয়ে এক নতুন গবেষণা দেখিয়েছে, বনভূমি ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে মশার আচরণেও বড় পরিবর্তন ঘটছে। আগে যে মশারা নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর রক্তের ওপর নির্ভর করত, এখন তারা ক্রমেই মানুষের রক্তকেই প্রধান খাদ্য হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এই পরিবর্তন মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ব্রাজিলের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত আটলান্টিক অরণ্য একসময় ছিল পৃথিবীর অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল। মানব বসতি, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নের চাপে এই বন আজ তার প্রাকৃতিক বিস্তৃতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বহু বন্যপ্রাণী এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে বা বিলুপ্ত হচ্ছে। মশারা কিন্তু সরে যায়নি। তারা নিজেদের অভিযোজিত করেছে মানুষের আধিপত্যে গড়ে ওঠা নতুন পরিবেশে।

ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশান জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, বনাঞ্চলের অবশিষ্ট অংশে ধরা পড়া বহু মশাই এখন মানুষের রক্ত পছন্দ করছে। গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেরোনিমো আলেনকারের মতে, এত বৈচিত্র্যময় প্রাণী থাকা সত্ত্বেও মানুষের রক্তের প্রতি এই ঝোঁক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

গবেষক দলটি রিও ডি জেনিরো রাজ্যের দুটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আলোর ফাঁদ বসিয়ে মশা সংগ্রহ করেন। যেসব স্ত্রী মশা সদ্য রক্ত পান করেছে, তাদের আলাদা করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। মশার দেহ থেকে রক্ত নিয়ে তার ডিএনএ বের করে বিশেষ জিনগত ‘বারকোড’ পদ্ধতি ব্যবহার করে এক ধরনের জিন শনাক্ত করা হয়, যা থেকে বোঝা যায় কোন প্রাণী থেকে রক্ত নেওয়া হয়েছে।

মোট ৫২ প্রজাতির ১,৭১৪টি মশা ধরা পড়ে। এর মধ্যে মাত্র ১৪৫টির শরীরে রক্ত পাওয়া যায় এবং ২৪টির রক্তের উৎস নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এর মধ্যে ১৮টি উৎসই মানুষের রক্ত। বাকি রক্তের উৎস ছিল পাখি, উভচর প্রাণী, ইঁদুর ও কুকুরজাতীয় প্রাণী। কিছু মশা একাধিক প্রাণী থেকেও রক্ত নিয়েছিল। এই মিশ্র রক্তগ্রহণ রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনাকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তোলে।

গবেষকদের মতে, এই প্রবণতার মূল কারণ পরিবেশগত পরিবর্তন। বন উজাড় হলে মশারা বাধ্য হয় মানুষের কাছাকাছি চলে আসতে। মানুষই তখন সবচেয়ে সহজলভ্য ও প্রচুর রক্তের উৎস । অথচ এই অঞ্চলের মশারা পীতজ্বর, ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া ও মায়ারো ভাইরাসের মতো মারাত্মক রোগ বহন করে।

অরণ্য সংরক্ষণ তাই শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর এক অপরিহার্য উপায়। মশার খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে এই জ্ঞান ভবিষ্যতে রোগ নজরদারি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং পরিবেশভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

সূত্র: Forest loss is driving mosquitoes’ thirst for human blood. Materials provided by Frontiers, published in Frontiers in Ecology and Evolution, 2026; 14 DOI: 10.3389/fevo.2025.1721533

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 14 =