ইনসুলিন আবিষ্কারের ইতিকথা 

ইনসুলিন আবিষ্কারের ইতিকথা 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬

১৯২০–এর দশকের শুরুতে টাইপ–১ ডায়াবেটিস মানেই ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। বিশেষ করে শিশুদের জন্য। বাবা–মায়েরা চোখের সামনে দেখতেন সন্তান ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। যতই খাওয়ানো হোক, ওজন কমছে, শরীর ভেঙে পড়ছে। বড়দের ক্ষেত্রেও রোগ নির্ণয়ের পর এক বছরের বেশি বাঁচা ছিল বিরল। ডাক্তারদের হাতে তখন কার্যত কিছুই ছিল না। কোনও ওষুধ নেই, কোনও ইনজেকশন নেই। চিকিৎসা বলতে ছিল ‘উপোস’। রোগীদের খুব কম খেতে দেওয়া হতো, তারা কার্যত না খেয়েই থাকত। আশা থাকত, রোগটা একটু ধীরে এগোবে। তবু বেশিরভাগই মারা যেত। চিকিৎসকেরা শুধু দেখতেন। এই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছিলেন ফ্রেডরিক ব্যান্টিং। কানাডার অন্টারিওর এক খামারে বড় হওয়া ব্যান্টিংয়ের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জেন চৌদ্দ বছর বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। সে দ্রুত শুকিয়ে যায়, দুর্বল হয়ে পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। ব্যান্টিং নিজে তার কফিন বহন করেছিলেন। সেই অসহায়তা তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়। মেডিক্যাল কলেজ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সার্জন হিসেবে কাজ এই সবকিছুর মধ্যেই ডায়াবেটিসের সেই স্মৃতি তাকে ছাড়েনি। ১৯২০ সালের ৩০শে অক্টোবরের রাতে, ব্যান্টিং অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস নিয়ে পড়াতে গিয়ে একটি মেডিক্যাল জার্নালে পড়েন এক অদ্ভুত কেস। প্যানক্রিয়াটিক নালীতে পাথর আটকে যাওয়ায় গ্রন্থির বেশিরভাগ অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু ‘ল্যাঙ্গারহ্যান্সের আইলেট’ নামক ছোট গুরুত্বপূর্ণ কোষগুচ্ছ বেঁচে আছে। বিজ্ঞানীরা আগেই ধারণা করতেন, এই আইলেট-কোষ রক্তে এমন কিছু ঢালে যা শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাহলে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওই নালী বন্ধ করে দেওয়া যায়, প্যানক্রিয়াস নষ্ট হতে দেওয়া হয়, আর আইলেট কোষ থেকে সেই “অভ্যন্তরীণ নিঃসরণ” আলাদা করা যায়, তাহলে কি ডায়াবেটিস থামানো সম্ভব হবে? তিনি সঙ্গে সঙ্গে অগোছালো কিন্তু তীব্র ভাষায় বিষয়টি নোটবুকে লিখে ফেলেন। তিনি তাঁর প্রস্তাব নিয়ে যান টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ম্যাকলিওড–এর কাছে। ম্যাকলিওড সন্দিহান ছিলেন। ব্যান্টিংয়ের গবেষণার অভিজ্ঞতা কম, তত্ত্বটাও ঝুঁকিপূর্ণ। তবু তিনি গবেষণার জন্য ল্যাব, কিছু কুকুর আর এক ছাত্র সহকারী দেওয়ার অনুমতি দিলেন। মুদ্রা টস হল। সহকারী হলেন ২২ বছরের চার্লস বেস্ট। ১৯২১ সালের ১৭ই মে কাজ শুরু হয়। সেটি ছিল এক অসহনীয় গ্রীষ্ম। কুকুরের প্যানক্রিয়াটিক নালী বাঁধা হতো, সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা। তারপর পাওয়া যাবে নির্যাস। অনেক কুকুর মারা যায়। বেশিরভাগ পরীক্ষা ব্যর্থ হল। ব্যান্টিং রেগে যান, হতাশ হন, তবু থামেন না। নভেম্বরে তারা দেখলেন, এক মারাত্মক ডায়াবেটিক কুকুরকে ৭০ দিন বাঁচিয়ে রাখা গেলো। ম্যাকলিওড বললেন, “এটা একটা বড় ব্যাপার”। ডিসেম্বরে এলেন বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপ। অ্যালকোহল ব্যবহার করে তিনি বিষাক্ত অংশটি সরিয়ে ফেলেন। ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে মানবদেহে প্রথম পরীক্ষা হল। ১৪ বছরের লিওনার্ড টমসন তখন মৃত্যুপথযাত্রী। অনাহারের মধ্য দিয়েই তাকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছিল। প্রথম ইনজেকশন ব্যর্থ হল। অ্যালার্জি আর ফোঁড়া দেখা দিল। ১২ দিন পর, ২৩ জানুয়ারি। দ্বিতীয় ইনজেকশন পড়ল। এইবার দেখা গেল, রক্তে শর্করার মাত্রা ধসে পড়েছে। লিওনার্ড-এর দেহে বল ফিরতে লাগলো। কয়েক সপ্তাহে তার ওজনও বাড়ল। কয়েক মাসে স্বাভাবিক জীবন। সে বাঁচে আরও ১৩ বছর। ডায়াবেটিসে নয়, নিউমোনিয়ায় মারা যায় লিওনার্ড। খবর ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কিছু আগে কখনও দেখা যায়নি। ‘ইনসুলিন’ নাম দেওয়া হল সেই পদার্থের। তারপর প্রশ্ন ওঠে এত ইনসুলিন বানাবে কে? উৎপাদনে এগিয়ে আসে এলি লিলি কম্পানি। ১৯২৩ সালে পেটেন্ট দেওয়া হয় ব্যান্টিং, বেস্ট আর কলিপকে। তাঁরা চাইলেই কোটিপতি হতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা পেটেন্ট বিক্রি করেন এক ডলারে। “ইনসুলিন আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়,” বলেছিলেন ব্যান্টিং। “এটা তামাম বিশ্বের”। ব্যান্টিং আর ম্যাকলিওড এর জন্য নোবেল পুরস্কার পান। দুঃখের কথা, চার্লস বেস্ট -কে অন্যায় ভাবে সে পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six + six =