স্থূলতা আর উচ্চ রক্তচাপ দু’টি প্রায়শই একসঙ্গে আসে। তারপর ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ে হৃদরোগ। আজ সারা বিশ্বে কার্ডিওভাসকুলার রোগ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন, অতিরিক্ত মেদ মানেই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি। কিন্তু কেন? চর্বিকে এতদিন ভাবা হয়েছে সেটি কেবল নিস্তেজ স্টোররুম। সে শুধু ক্যালোরি জমিয়ে রাখে, আর কিছু নয়। নতুন এক গবেষণা বলছে, চর্বি সক্রিয়ভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করে। আমাদের শরীরে মূলত তিন ধরনের চর্বি থাকে। হোয়াইট ফ্যাট, যা ক্যালোরি জমায়। ব্রাউন ফ্যাট, যা তাপ তৈরি করে। আর বেইজ ফ্যাট, যা প্রয়োজনে ব্রাউন ফ্যাটের মতো আচরণ করে। বেইজ ফ্যাট শক্তি পোড়ায়, শরীর গরম রাখে এবং বিপাক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। নবজাতক শিশুদের শরীরে ব্রাউন ফ্যাট বেশি থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরেও কিছুটা থাকে, বিশেষ করে ঘাড় ও কাঁধের আশপাশে। আগের কিছু ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছিল, যাদের ব্রাউন বা বেইজ ফ্যাট বেশি, তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু সেটুকু ছিল কেবল সম্পর্ক মাত্র। কার্য-কারণ নয়।
পল কোহেন ও তাঁর দল কোহেন মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং-এ রোগী চিকিৎসা করেন এবং একই সঙ্গে চালান মলিকিউলার মেটাবলিজম ল্যাব। তাঁরা এমন ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের শরীর এই বেইজ ফ্যাট তৈরি করতে পারে না। অন্য সব দিক থেকে কিন্তু ইঁদুরগুলি ছিল পুরোপুরি সুস্থ। না স্থূলতা, না কোন প্রদাহ। তারা চর্বি কোষে Prdm16 নামে একটি জিন বন্ধ করে দেন। এই জিনই বেইজ ফ্যাট ধরে রাখে। ফলাফল ছিল স্পষ্ট। ইঁদুরগুলির চর্বি, ধীরে ধীরে সাদা চর্বির মতো আচরণ শুরু করে। আর তখনই শুরু হয় সমস্যা। এতে ইঁদুরদের রক্তচাপ বেড়ে যায়। তাদের রক্তনালির চারপাশে জমতে থাকে শক্ত, ফাইব্রাস টিস্যু। রক্তনালিগুলি হয়ে ওঠে কম নমনীয়। গবেষকরা দেখেন, এই নালিগুলি ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন II’ প্রভৃতি রক্তচাপ বাড়ানো সংকেতের প্রতি অস্বাভাবিক অতিসংবেদনশীল হয়ে পড়ছে – স্থূলতা ছাড়াই। অর্থাৎ, শুধু বেইজ ফ্যাট হারালেই শরীর উচ্চ রক্তচাপের দিকে চলে যেতে পারে। সিঙ্গল-নিউক্লিয়াস RNA সিকোয়েন্সিং ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেন, বেইজ ফ্যাট না থাকলে রক্তনালির কোষে এমন জিন সক্রিয় হচ্ছে, যা টিস্যুকে শক্ত করে ফেলে। এরপর তারা চর্বি কোষ থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক সংকেত বিশ্লেষণ করেন। সেখানেই সামনে আসে এক উৎসেচক QSOX1। এই উৎসেচক ক্যান্সারে টিস্যু পুনর্নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত বলে আগেই পরিচিত ছিল। তবে নতুন তথ্য বলছে, স্বাভাবিক বেইজ ফ্যাট QSOX1-কে দমিয়ে রাখে। কিন্তু বেইজ ফ্যাট তার আচরণ হারালে QSOX1 বেড়ে যায়, আর সেখান থেকেই প্রশস্ত হয় উচ্চ রক্তচাপের রাস্তা। এই প্রমাণ আরও শক্ত করতে, গবেষকরা এমন ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের শরীরে Prdm16 নেই, আবার QSOX1-ও নেই। ফল? বেইজ ফ্যাট নেই, তবুও তাদের রক্তনালি সুস্থ, রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে। এই গবেষণা শুধু ল্যাবেই থেমে থাকেনি। বড় ক্লিনিক্যাল উপাত্তে দেখা গেছে, যাদের PRDM16 জিনে মিউটেশন আছে, তাদের রক্তচাপ তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ ইঁদুর আর মানুষের গল্প মিলছে। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ অনেক আছে। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে নতুন রাস্তা। চর্বি ও রক্তনালির মধ্যকার আণবিক কথোপকথন থামানোর কথা বলছে। বিশেষ করে QSOX1-এর মতো নির্দিষ্ট নিশানা মুখী চিকিৎসা ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপের নতুন চিকিৎসার দরজা খুলতে পারে।
সূত্র: Ablation of Prdm16 and beige fat identity causes vascular remodeling and elevated blood pressure; Science
