প্রায় এক শতাব্দী ধরে এটি ছিল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক কল্পিত অস্তিত্ব। সমীকরণে স্পষ্ট, অথচ বাস্তব জগতে অদৃশ্য। তত্ত্বে জানা, কিন্তু প্রকৃতি যেন চুপ। অবশেষে সেই নীরবতা ভাঙল। ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক যুগান্তকারী পরীক্ষার বিবরণে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন তাঁরা সরাসরি প্রমাণ পেয়েছেন ‘মিগডাল এফেক্ট’-এর। এই সাফল্য শুধু পাঠ্যবইয়ের পদার্থবিদ্যার জন্য নয়, ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধানে ব্যবহৃত আমাদের সবচেয়ে উন্নত ডিটেক্টর ও টেলিস্কোপগুলোর ক্ষমতাকেও নতুন স্তরে নিয়ে গেছে।
১৯৩৯ সালে সোভিয়েত পদার্থবিদ আর্কাদি মিগডাল এক সাহসী ও বিপরীতমুখী ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, কোনো চার্জহীন কণা যেমন-নিউট্রন, যখন একটি পরমাণুর কেন্দ্রকে আঘাত করে, তখন ঘটনাটি কেবল কেন্দ্রকের সরে যাওয়াযর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আঘাতটি যদি যথেষ্ট আকস্মিক হয়, কেন্দ্রক হঠাৎ স্থানচ্যুত হয়, কিন্তু কেন্দ্রককে ঘিরে থাকা ইলেকট্রনের বিস্তৃত বলয় সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। যেমন হঠাৎ টেবিলক্লথ টেনে নিলে থালাবাসন কিছুক্ষণের জন্য স্থির থেকে যায়, কিন্তু টেবিলটা একটু সরে যায়। সেই ক্ষণিক ফাঁকেই একটি ইলেকট্রন পরমাণু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসে – এই অতি সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াই হল মিগডাল এফেক্ট।
কিন্তু এই প্রভাব এতটাই বিরল ও সূক্ষ্ম যে প্রায় ৮৭ বছর ধরে এটি কেবল তাত্ত্বিক হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। অবশেষে চীনের একাডেমি অব সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে একদল গবেষক বিশেষভাবে নকশা করা গ্যাস ডিটেক্টর ও নিয়ন্ত্রিত নিউট্রন আঘাতের সাহায্যে সেই ক্ষুদ্র সংকেতকে আলাদা করে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। যা এতদিন কেবল সমীকরণে বাস করত, তা এবার বাস্তবের আলোয় ধরা পড়ল।
এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব উন্মোচিত হয় ডার্ক ম্যাটার নিয়ে গবেষণায়। মহাবিশ্বের অধিকাংশ ভর যে এক অদৃশ্য পদার্থে গঠিত, তা আমরা জানি—কিন্তু তাকে ধরা যায় না। প্রচলিত পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা গভীর ভূগর্ভে বিশাল জেনন বা আর্গনের ডিটেক্টর বসান, যেখানে ডার্ক ম্যাটার কণার আঘাতে নিউক্লিয়াসের সামান্য নড়াচড়া ধরা পড়ে। সমস্যা হলো, ডার্ক ম্যাটার যদি খুব হালকা হয়, তার আঘাতও এতটাই কোমল হবে যে নিউক্লিয়াস প্রায় নড়বেই না, ফলে ডিটেক্টর কিছুই ধরতে পারবে না।
মিগডাল এফেক্ট এই অন্ধত্বকেই ভেঙে দেয়। কেন্দ্রক সামান্য নড়লেও একটি ইলেকট্রন ছিটকে যেতে পারে, আর সেই ইলেকট্রন বহন করে এক স্পষ্ট ও শক্তিশালী সংকেত। এখন এই প্রভাব পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়, বিজ্ঞানীরা নির্ভুলভাবে যন্ত্রের সাহায্যে নিখুঁত মান নির্ধারণ করে এই একা পড়ে যাওয়া ইলেকট্রনগুলোর খোঁজ করতে পারবেন। এর ফলে ডার্ক ম্যাটারের ভরের যে নিম্নসীমা এতদিন অনুসন্ধানের বাইরে ছিল, সেগুলো খোঁজার পথ খুলে গেল।
প্রায় ৯০ বছর আগে উপস্থাপিত একটি তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী আজ পরীক্ষামূলক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। অদৃশ্য মহাবিশ্বের দিকে তাকানোর জন্য মানবজাতি যেন পেল এক নতুন চোখ। আর এই চোখে ধরা পড়তে পারে সেই অন্ধকার পদার্থ, যা নীরবে গোটা মহাবিশ্বকে বেঁধে রেখেছে।
সূত্রঃ Difan Yi et al, Direct observation of the Migdal effect induced by neutron bombardment, Nature (2026). DOI: 10.1038/s41586-025-09918-8
