বছর-সেরা বিজ্ঞানী নলিনী জোশী

বছর-সেরা বিজ্ঞানী নলিনী জোশী

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬

২০২৫ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস বছর-সেরা বিজ্ঞানী নির্বাচিত হলেন অধ্যাপক নলিনী জোশী। এই প্রথম নিউ সাউথ ওয়েলসের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মান উঠে এলো একজন গণিতবিদের হাতে। ল্যাব কোট আর পেট্রি ডিশের বাইরেও যে বিজ্ঞান বেঁচে থাকে, এই পুরস্কার যেন সেই বার্তাই দিল। নলিনী জোশী কেবল “আরেকজন সফল গণিতবিদ” নন, তাঁর কাজ ‘ইন্টিগ্রেবল সিস্টেম’ নামের জটিল গাণিতিক জগৎকে নতুন ভাষা দিয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সিডনিতে গণিতের প্রথম মহিলা অধ্যাপক হওয়া থেকে শুরু করে বর্তমানে চেয়ার অব অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেমেটিক্স- তার যাত্রাপথ এক সামাজিক ও বৌদ্ধিক বিদ্রোহের গল্প। কিন্তু তাঁর কাজ শুধু তত্ত্বের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এখন দাঁড়িয়ে আছেন ভবিষ্যতের এক ক্রান্তিক মোড়ে, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির সামনে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে আমরা সাধারণত স্বপ্ন দেখি। নতুন ওষুধ, উন্নত উপাদান, অসম্ভব গণনা। জোশী মনে করিয়ে দেন এর উল্টো দিকটাও। এই একই প্রযুক্তি আমাদের ডিজিটাল সভ্যতার নিরাপত্তা ভেঙে চুরমার করতে পারে। “কুড়ি বছর আগে স্মার্টফোন ছিল না। আজ কফি কেনা থেকে টাকা লেনদেন সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল, আর কুড়ি বছর পর, আমরা কোয়ান্টাম-সক্ষম ডিভাইস নিয়ে হাঁটব, কোয়ান্টাম টাকা থাকবে পকেটে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখার মতো জ্ঞান আমাদের শিল্পক্ষেত্রে প্রায় নেই। গোটা অস্ট্রেলিয়ায় হয়তো ডজনখানেক লোকও নেই, যাঁরা সত্যিই জানেন কীভাবে এই নিরাপত্তা গড়ে তুলতে হয়।”- জোশী বলেন। এই সতর্কবাণীই তাঁকে শুধু একজন গবেষক নয়, একজন সময়ের বিশ্লেষকও করে তোলে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট, ইউনিভার্সিটি মেডেলজয়ী সিডনি গ্র্যাজুয়েট, আন্তর্জাতিক গাণিতিক ইউনিয়নের প্রথম অস্ট্রেলীয় মহিলা ভাইস-প্রেসিডেন্ট, অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়ার অফিসার- তাঁর সম্মান লাভের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার হয়তো সংখ্যার বাইরেই। নারী ও সংখ্যালঘুদের জন্য বিজ্ঞানকে আরও উন্মুক্ত করে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে। তরুণ গবেষকদের মেন্টরশিপের জন্য ২০১৮ সালের ইউরেকা প্রাইজ তারই স্বীকৃতি।

এই বছরের NSW Premier’s Prizes for Science-এ সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দু’জন গবেষকও আলোয় এলেন। অধ্যাপক অ্যানিটা হো-বেইলি এবং ন্যানোসায়েন্সের জন হুক চেয়ার পেলেন গণিত, ভূবিজ্ঞান, রসায়ন বা পদার্থবিজ্ঞানে উৎকর্ষের পুরস্কার। তাঁর পেরোভস্কাইট সৌরকোষ গবেষণা নবায়নযোগ্য শক্তির ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। এ সৌরকোষ হালকা, নমনীয়, সস্তা, এমনকি মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী। উপগ্রহ চালানো থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার “সার্বভৌম মহাকাশ ক্ষমতা” সবক্ষেত্রেই তাঁর কাজের ছাপ। “এই পুরস্কার আমাদের সাহস জোগায়, সাহসী ধারণাই বাস্তব দুনিয়ায় পরিবর্তন আনে-এই বিশ্বাসটাকেই আরও যেন শক্ত করে” – বলেন হো-বেইলি। এছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের অঙ্গনে পুরস্কার পেলেন, অধ্যাপক পল কিল। মেডিক্যাল ফিজিক্সের এই গবেষক ক্যান্সার ইমেজিং ও লক্ষ্যভিত্তিক রেডিয়েশন থেরাপিকে নিয়ে গেছেন নতুন স্তরে। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ ক্যান্সার রোগীর জীবনমান উন্নত করেছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বিশ্বজুড়ে রেডিয়েশন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অর্ধেক করে দেওয়া।

তিনটি নাম, তিনটি ক্ষেত্র। কিন্তু সুর অভিন্ন। বিজ্ঞান এবং গবেষণা আর দূরের কোনও গজদন্ত মিনারের বিষয় নয়। তা রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও মানবজীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আর সেই বাস্তবতাকে সবচেয়ে তীক্ষ্ণভাবে দেখিয়ে দিলেন নলিনী জোশী। যিনি প্রমাণ করলেন, কখনও কখনও সবচেয়ে বৈপ্লবিক বিজ্ঞান শুরু হয় নিঃশব্দ সংখ্যার ভিতর থেকেই।

 

সূত্র: University of Sidney

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + five =