উপকূলরক্ষক জীবন্ত প্রাচীর 

উপকূলরক্ষক জীবন্ত প্রাচীর 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

প্রবাল প্রাচীর উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় প্রকৃতির এক অসাধারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সমুদ্রের তলদেশে গড়ে ওঠা এই জীবন্ত কাঠামোগুলো শুধু সামুদ্রিক প্রাণীদের আবাসস্থলই নয়, বরং বাস্তবে উপকূলীয় সমাজের জন্য এক অদৃশ্য প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এরা ঝড়, ঢেউ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রবাল প্রাচীরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান হলো ঢেউয়ের শক্তি শোষণ ও প্রশমন। সমুদ্রগর্ভ থেকে আসা শক্তিশালী ঢেউ উপকূলে পৌঁছানোর আগেই প্রবাল প্রাচীরের জটিল কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ প্রবাল প্রাচীর ঢেউয়ের শক্তি প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে উপকূলে আঘাত হানা ঢেউের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভূমিক্ষয়, প্লাবন ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বিশেষত বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঝড়ের জলোচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রণে প্রবাল প্রাচীর অব্যর্থ। সাইক্লোন, হারিকেন বা সুনামির মতো চরম দূর্যোগপূর্ণ ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রবাল প্রাচীর বড় বড় গগনচুম্বী ঢেউকে ভেঙে দেয় এবং জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও তীব্রতা কমায়। এর ফলে উপকূলবর্তী জনবসতি, রাস্তা, কৃষিজমি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। যেখানে প্রবাল প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলুপ্ত, সেখানে ঝড়ের অভিঘাত অনেক বেশি প্রাণঘাতী।

এছাড়াও, প্রবাল প্রাচীর উপকূলীয় পলিমাটি ও সমুদ্রতট স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। ঢেউয়ের গতি কমানোর মাধ্যমে প্রবাল প্রাচীর সৈকতের বালি ও পলিমাটি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে সৈকতের ভাঙন রোধ হয় এবং ম্যানগ্রোভ বন ও সামুদ্রিক ঘাসের মতো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সুস্থ থাকে, যা আবার উপকূলের সুরক্ষায় সহায়ক।

প্রবাল প্রাচীর দীর্ঘমেয়াদে উপকূলের সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ায়। এগুলো জীবন্ত কাঠামো—সময়ের সঙ্গে বেড়ে উঠতে ও নিজেকে আংশিকভাবে পুনর্গঠন করতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঝড়ের তীব্রতা বাড়লেও, সুস্থ প্রবাল প্রাচীর তুলনামূলকভাবে টেকসই ও কম ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে, প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হলে উপকূলীয় সমাজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। উপকূলীয় ক্ষয় দ্রুত বেড়ে যায়, ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, এবং মৎস্য ও পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষতি দেখা দেয়। যেহেতু প্রায় ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক প্রাণী প্রবাল প্রাচীরের ওপর নির্ভরশীল, তাই এর ক্ষয় জীববৈচিত্র্যের ধস নামাতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করে দিতে পারে। উপরন্তু, প্রাকৃতিক সুরক্ষা হারালে সরকার ও স্থানীয় জনগণকে ব্যয়বহুল কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণে বিনিয়োগ করতে হয়, যা প্রায়ই কম কার্যকর এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণসাপেক্ষ। সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রবাল প্রাচীর উপকূলীয় সুরক্ষা, পরিবেশগত ভারসাম্য ও মানবকল্যাণের জন্য অপরিহার্য এক প্রাকৃতিক ঢাল। তাই এ হেন বাস্তবতায় প্রবাল প্রাচীরের সংরক্ষণ শুধুমাত্র পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে নয় , বরং উপকূলীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য শর্ত।

 

সূত্র: How do coral reefs contribute to coastal protection, and what risks do communities face if reefs are lost? By Coral Reef Conservation.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + twelve =