অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরী ও তাঁর সমীকরণ 

অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরী ও তাঁর সমীকরণ 

অধ্যাপক অর্ণব রায়চৌধুরী
আই আই এস সি-র (ব্যাঙ্গালোর) প্রাক্তন অধ্যাপক ; বিষয় : Astrophysical Magnetohydrodynamics.
Posted on ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

(পর্ব – ২) 

জীবনসংগ্রাম

১৯২৩ সালে বরিশালে অমল রায়চৌধুরীর জন্ম। বাবা ছিলেন অঙ্কের স্কুলশিক্ষক। অমলবাবুর স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা কলকাতায় – যথাক্রমে হিন্দু স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। MSc-র পরে তিনি ডক্টরেটের গবেষণার জন্য যোগদান করলেন যাদবপুরে অবস্থিত IACS অর্থাৎ Indian Association for the Cultivation of Science-এর একটি ল্যাবরেটরিতে। এটা তাঁর একটা বড়ো ভুল পদক্ষেপ হয়েছিল। যদিও তাঁর মনপ্রাণ পড়ে থাকত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে, তাঁকে এখন নজর দিতে হল কেন ল্যাবরেটরিতে পাম্প ঠিকমতো কাজ করছে না। চার বছরের মধ্যে কাজের কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হল না। যে প্রজেক্টে তিনি কাজ করছিলেন তার মূল্যায়ন করতে এই সময়ে বিশেষজ্ঞদের একটি দল এলেন। কাজে যথেষ্ট অগ্রগতি না হওয়ার জন্য প্রজেক্টটা বন্ধ করে দেওয়া হল। আশুতোষ কলেজে পদার্থবিজ্ঞান পড়াবার একটা চাকরি পেয়ে অমলবাবু সেখানে চলে গেলেন। সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অমলবাবু লিখেছেন, “চার চারটে বছর – আমার বাইশ থেকে ছাব্বিশ এত অমূল্য চারটে বছর ! তাতে আমি পেলাম চরম বিফলতা। সে সময়টা আমার বড় দুর্দিন। পেছনে বিফলতার কালিমা, সামনে চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তার ওপরে পাচ্ছি সবার সহানুভূতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এত ভাল ছাত্র কিন্তু গবেষণায় কিছুই করতে পারল না। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে ।”

IACS-এ কাজ করার সময়টা কিন্তু অমলবাবুর সম্পূর্ণ বৃথা যায় নি। সেখানকার লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করে তিনি সম্পূর্ণ নিজের অধ্যবসায়ে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের মতো একটা অত্যন্ত কঠিন বিষয় অনেকটা আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। এবার আশুতোষ কলেজে পদার্থবিজ্ঞান পড়াবার ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন সেই সময়টাতে একা একাই তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন। বছর-তিনেকের মধ্যে তাঁর লেখা তিনটি গবেষণাপত্র পদার্থবিজ্ঞানের বিখ্যাত জার্নাল Physical Review-তে প্রকাশিত হল । এর মধ্যে একটি গবেষণাপত্র বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে । যদিও আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব থেকেই ব্ল্যাক হোলের ধারণাটা এসেছে এই ধারণাটা আইনস্টাইনের নিজের খুব একটা মনঃপূত ছিল না। একটি গবেষণাপত্রে তিনি কতগুলো যুক্তি দিলেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে সত্য সত্যই ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হবার বিশেষ সম্ভাবনা নেই। অমলবাবু আইনস্টাইনের সেই যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করে দেখালেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে কিভাবে ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হতে পারে। ২৯ বছর বয়সের একজন যুবক যাঁর চাকরির স্থিরতা নেই, যাঁর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, যাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধান করার মতো সিনিয়র কেউ নেই – তিনি গবেষণায় হাত পাকালেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীর উদ্দেশ্যে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে ! সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, পরের কয়েক বছরের মধ্যে বোঝা গেল যে আইনস্টাইনের যুক্তিগুলোর মধ্যে সত্যই অসঙ্গতি ছিল, সেগুলো খণ্ডন করে অমলবাবু যা লিখেছিলেন সবই সম্পূর্ণ ঠিক। এইরকম একটা কাজ করার জন্য যুগপৎ যে দুঃসাহস ও যে প্রখর বৈজ্ঞানিক মেধার প্রয়োজন ছিল তা যেন আমাদের কল্পনারও বাইরে ।

এই সময়ে IACS-এ রিসার্চ অফিসার পদের জন্য একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। কয়েকটা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হবার পরে ততদিনে অমলবাবুর আত্মবিশ্বাস খানিকটা ফিরে এসেছে। তিনি এই পদের জন্য দরখাস্ত করলেন ও নির্বাচিত হলেন। আশুতোষ কলেজে তিন বছর কাটাবার পরে ১৯৫২ সালে অমলবাবু আবার ফিরে এলেন IACS-এ । তাঁর আশা ছিল, IACS-এর উৎকৃষ্ট লাইব্রেরি ব্যবহার করে এবার তিনি নিশ্চিন্তমনে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে গবেষণা করে যাবেন। কিন্তু তার বদলে যা ঘটল তা কলকাতায় পদার্থবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে এক অন্ধকার কলঙ্কিত অধ্যায়। মেঘনাদ সাহার সঙ্গে অমল রায়চৌধুরীর যে সংঘাত বাধল তাই নিয়ে অমলবাবু ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ প্রবন্ধে খানিকটা বিস্তারিত আলোচনা করে গেছেন। বিষয়টা নিয়ে যাঁরা আরও জানতে চান, তাঁদের অনুরোধ করব এই প্রবন্ধটা পড়ে দেখতে। এখানে এই দুঃখজনক ঘটনাচক্রের সামান্য একটু সারাংশ মাত্র দিচ্ছি ।

অমলবাবু যখন IACS-এ যোগদান করলেন ঠিক সেই সময়েই মেঘনাদ সাহা এই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হয়ে এলেন । নতুন ডিরেক্টর জানতে চাইলেন তাঁর প্রতিষ্ঠানে সদ্য চাকরি-পাওয়া তরুণ বিজ্ঞানী কী গবেষণা করছেন । অমলবাবুর আশা ছিল, বিভিন্ন বিখ্যাত জার্নালে নিয়মিত তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে দেখে সাহা তাঁকে উৎসাহ দেবেন । কিন্তু মেঘনাদ সাহার মনে হল, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের মতো একটা দুরূহ বিমূর্ত বিষয় – যার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনও যোগাযোগ নেই – সেই বিষয় নিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের একজন তরুণ বিজ্ঞানী একা একা কাজ করবেন এটা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। তিনি নির্দেশ দিলেন, অমলবাবু যেন সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে গবেষণা ছেড়ে দিয়ে IACS-এর কোনও গবেষক-গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে-মিশে কাজ করেন। তাঁর চাকরির confirmation letter-এ একটা অপমানজনক শর্ত দেওয়া হল, ডিরেক্টর ও বিভাগীয় প্রধান তাঁকে যা নিয়ে গবেষণা করতে বলবেন তাই তিনি করবেন । অধ্যাপক সাহা ঠিক করে দিলেন যে অমলবাবুকে কোয়ান্টাম রসায়ন নিয়ে গবেষণা করতে হবে। যদিও এই বিষয়টাতে অমলবাবুর বিশেষ আগ্রহ ছিল না, কিছুদিনের মধ্যে বিষয়টা শিখে নিয়ে তিনি এমন একটা গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন যেটা সেই বিষয়ের বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী কুলসনের ভূয়সী প্রশংসা পেল। কলকাতার রাসায়নিক মহলে অমলবাবুর খানিকটা খ্যাতি হয়ে গেল।

অমলবাবুর মন কিন্তু পড়ে রইল সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে। কোয়ান্টাম রসায়নে গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদেও গবেষণা চালিয়ে তিনি একটা গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন। তখনকার দিনে IACS-র কোনও বিজ্ঞানীকে জার্নালে গবেষণাপত্র পাঠাতে হলে আগে বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি নিতে হত। বিভাগীয় প্রধান বলে দিলেন, অমলবাবু যেহেতু ডিরেক্টরের নির্দেশ লঙ্ঘন করে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন সেহেতু ওই বিষয়ের ওপরে লেখা তাঁর কোনও গবেষণাপত্র আর জার্নালে পাঠাবার অনুমতি দেওয়া হবে না । একেবারে ‘বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ’ অবস্থা । ব্যাপারটা মেঘনাদ সাহার কর্ণগোচর হলে তিনি বিভাগীয় প্রধানকে নির্দেশ দিলেন অমলবাবুর গবেষণাপত্রটা জার্নালে পাঠিয়ে দিতে ।

এইরকম অবস্থার মধ্যে লেখা হল সেই বিখ্যাত গবেষণাপত্র যাতে রায়চৌধুরী সমীকরণ প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হবার অল্প দিন পরেই হামবুর্গে অধ্যয়নরত এক বন্ধুর চিঠি থেকে অমলবাবু জানতে পারলেন, সেখানকার বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী পাস্কুয়াল ইয়র্ডান (কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম জনক) তাঁর একটি সেমিনারে অমলবাবুর কাজ নিয়ে সপ্রশংস আলোচনা করেছেন। একটু সাহস পেয়ে অমলবাবু তাঁর গবেষণার কাজ থিসিসের আকারে লিখে DSc ডিগ্রির জন্য জমা দিলেন। সৌভাগ্যক্রমে থিসিসটা মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হল আরেক বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হুইলার, যিনি রিচার্ড ফেইনম্যানের থিসিসের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। অমলবাবুর থিসিসের রিপোর্টে হুইলার লিখলেন, ‘He has given an answer to the most outstanding problem in relativistic cosmology’ । এই রিপোর্টটা পড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য অধ্যাপক সিদ্ধান্ত স্তম্ভিত হয়ে হলেন। তাঁকে উপাচার্য হিসাবে সব থিসিসের রিপোর্টেই একবার চোখ বুলিয়ে দেখতে হয়। এরকম রিপোর্ট তিনি কখনও দেখেন নি তাও আবার একজন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীর লেখা রিপোর্ট। তিনি সেনেটের পরবর্তী মিটিংয়ে সম্পূর্ণ রিপোর্টটা পড়ে শোনালেন। কলকাতার বিদ্বমহলে এই থিসিসের রিপোর্টের কথাটা খানিকটা ছড়িয়ে পড়ল ।

এই সময়ে মেঘনাদ সাহার আকস্মিক অকালমৃত্যু ঘটে । অমলবাবু বুঝতে পারছিলেন, এবার তাঁর নিজের মতো গবেষণা চালিয়ে যাবার স্বধীনতায় আর হস্তক্ষেপ করা হবে না । কিন্তু ততদিনে IACS-এর ব্যাপারে তাঁর মন ভেঙে গেছে । এই সময়ে IACS-এ ডিরেক্টর হয়ে এলেন কেদারেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি অমলবাবুর থিসিসের রিপোর্টের কথা শুনেছিলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য অমলবাবুকে একটা প্রমোশান দেওয়া হোক। কিন্তু অধ্যাপকেরা সবাই তার প্রতিবাদ করলেন । IACS-এর তরুণ বিজ্ঞানীরা সবাই নাকি অমলবাবুর সমতুল্য ভালো কাজ করছেন। শুধুমাত্র একজনকে প্রমোশান দিলে অন্যদের প্রতি অবিচার করা হবে। অমলবাবুকে প্রমোশান দেওয়া গেল না । এর পরে তিনি আর IACS-এ থাকতে চাইলেন না । DSc ডিগ্রির ভিত্তিতে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের চাকরি পেলেন। এই চাকরি নিয়ে তিনি IACS ছেড়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে চলে গেলেন। তাঁর জীবনসংগ্রামের একটা অধ্যায়ের শেষে এখানেই যবনিকা পতন হল ।

 

শেষের কথা

১৯২০-র দশকে সাহা আয়নন তত্ত্ব, বোস পরিসংখ্যান ও রামন বিচ্ছুরণের মতো তিনটে আবিষ্কার বিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানী মহলকে একেবারে চমকে দেয়। অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার আমাদের দেশে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার একটা জোরালো ধারা তৈরি হয়ে যাবে। তা কিন্তু হল না । আমাদের দেশে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার এই স্বর্ণযুগ যেমন আবির্ভূত হয়েছিল আকস্মিকভাবে, তার অবসানও যেন ঘটল তেমনই আকস্মিকভাবে। কলকাতায় পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার একটা জোরালো ধারা কেন তৈরি হল না এই প্রশ্নের উত্তর যাঁরা খুঁজতে চান তাঁদের কাছে অমল রায়চৌধুরীর ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। আমাদের দেশে পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার ধারা গড়ে তুলতে যে নেতৃত্ব মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন বোসের কাছে প্রত্যাশিত ছিল সেই নেতৃত্ব যে তাঁরা দেন নি এটাই তাঁদের সম্পর্কে অমলবাবুর গুরুতর অভিযোগ। মেঘনাদ সাহার সামগ্রিক মূল্যায়ন অমলবাবু করেছেন এইভাবে, “অধ্যাপক মেঘনাদ সাহার স্থান বিজ্ঞানী হিসেবে আমার অনেক অনেক উপরে। তাঁর বিজ্ঞানে অবদানের জন্য আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমার মনে হয় পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি তাঁর যে কর্তব্য ছিল, সেখানে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অহমিকায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি কোনও কোনও বিষয়ে বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে ছিলেন। এটা শুধু তাঁরই না, সমগ্র দেশেরই দুর্ভাগ্য এবং সেই দুর্ভাগ্যের জন্য আমাকে দুঃখ বেদনা পেতে হলো ।“ অমলবাবুর কাজ বুঝবার মতো সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে অতটা জ্ঞান হয়তো মেঘনাদ সাহার ছিল না । কিন্তু সত্যেন বোসই প্রথম আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে লেখা গবেষণাপত্র জার্মান থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর যে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের জটিল তত্ত্বে যথেষ্ট অধিকার ছিল তা তর্কাতীত। তবুও কেন যে তিনি তাঁর নিজের শহর কলকাতা থেকে করা পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানী অমল রায়চৌধুরীর কাজ বুঝবার চেষ্টা করেন নি বা তাঁকে উৎসাহ দেন নি সেটা আমাদের কাছে একটা রহস্য। একবার অমলবাবু যখন তাঁর কাজ নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেই বক্তৃতা শুনে সত্যেন বোস নাকি মন্তব্য করেন, “কাজটা কিছুই হয় নি, তবে ছেলেমানুষ কিছু যে করেছে (যত বাজেই হোক) তার জন্য ওকে ভাল বলি – আশা করি ভবিষ্যতে শুধরে যাবে ।”

প্রেসিডেন্সি কলেজে অমলবাবু প্রায় তিন দশক অধ্যাপনা করেছিলেন। আগেই উল্লেখ করেছি, বিজ্ঞানী হিসাবে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতির কথা অনেকদিন কলকাতায় খুব বেশি কারও জানা ছিল না। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কলেজে পড়বার সময়ে আমরা আরও একজন অসাধারণ শিক্ষককে পেয়েছিলাম – অধ্যাপক শ্যামল সেনগুপ্ত। যারা পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করতে চায় তাদের কাছে প্রেসিডেন্সি কলেজ একটা তীর্থক্ষেত্র হয়ে ওঠে অমলবাবু ও শ্যামলবাবুর পড়ানোর জন্য । এঁদের দু’জনের পড়ানোর স্টাইলে অবশ্য কোনও মিল ছিল না। অমলবাবুর ক্লাস হত একক মঞ্চাভিনয়ের মতো । আর শ্যামলবাবু চেষ্টা করতেন ছাত্রদেরও পদার্থবিজ্ঞানের আলোচনায় অংশ নেওয়াতে যদিও তাঁর সেই চেষ্টা অনেক সময়েই খুব একটা ফলপ্রসূ হত না এবং আমরা প্রায়ই শ্যামলবাবুর কাছে বকুনি খেতাম, কেন আমরা আলোচনায় অংশ না নিয়ে চুপ করে বসে রয়েছি !

আমরা যখন অমলবাবুকে প্রথম দেখি, তখন তিনি সবে পঞ্চাশের কোঠায় পা দিয়েছেন । কিন্তু তাঁর মাথার চুল তার মধ্যেই সম্পূর্ণ পেকে গিয়েছিল। তাঁকে আমরা কখনও ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য পোশাকে দেখিনি। শুভ্রবেশ শুভ্রকেশ অমলবাবু যখন একচ্ছত্র সম্রাটের মতো ভঙ্গিতে ক্লাসে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়াতেন তখন অত্যন্ত কবিত্ববোধশূন্য ব্যক্তির মনেও একটা উপমা চলে আসত, তাঁকে যেন জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো দেখাচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞান বিশ্লেষণ করে যে ছাত্রদের মনকে কতটা ধাক্কা দেওয়া যায় সেটা তাঁর ক্লাস করতে গিয়েই প্রথম বুঝি। মনে আছে, তাঁর অনেক ক্লাসের পরে আমি প্রায় দু-তিন ঘন্টা আর কোনও কিছুতে মন দিতে পারতাম না, তাঁর বক্তৃতাটাই বারবার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকত। দেশে-বিদেশে আমার বেশ কয়েকজন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকের ক্লাস করার সুযোগ হয়েছে । অমলবাবুর মতো পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর ক্ষমতা বোধহয় আর কারও মধ্যে দেখি নি । যদিও আমার নিজের পড়ানোর ক্ষমতা নিতান্তই সীমাবদ্ধ, কয়েক বছর পরে যখন আমাকে Indian Institute of Science-এ পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো শুরু করতে হল তখন আমি সচেতনভাবে অমলবাবুর পড়ানোর স্টাইল নকল করতে লাগলাম ।

অমল রায়চৌধুরী পরলোকগমন করেন ২০০৫ সালে। ২০০২ সালে লেখা ‘আত্মজিজ্ঞাসা’ প্রবন্ধের শেষে তিনি লিখেছেন, “বিজ্ঞানী মহলের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয় ১০/২০ বছর বিজ্ঞানের আলোচনায় আমার কাজের একটা স্থান থাকবে কিন্তু মনে হয় বড়জোর বছর পঞ্চাশ, তারপরে আমার কজের কোন স্থানই থাকবে না ।”

অমলবাবুর এই মন্তব্যটা নিয়ে অনেক বার ভেবেছি। তিনি কি বাড়াবাড়ি বিনয় দেখাবার জন্য মন্তব্যটা করেছিলেন, নাকি তিনি যা লিখেছেন তা তিনি সত্য সত্যই বিশ্বাস করতেন ? আজকের ইন্টারনেটের যুগে কোন বিজ্ঞানীর কাজ নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে কতটা আলোচনা হচ্ছে সেই খবরটা খুব সহজেই বের করে ফেলা যায় । অমলবাবু এই মন্তব্যটা করার পরে ২০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে । ২০ বছর আগে যতজন পদার্থবিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণাপত্রে অমলবাবুর বিখ্যাত কাজটার উল্লেখ করতেন এখন তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় পদার্থবিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণাপত্রে ওই কাজটার উল্লেখ করছেন। সাধারণ আপেক্ষিকবাদ নিয়ে যতদিন গবেষণা হবে, মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য যতদিন মানুষকে ভাবাবে, ততদিনই অধ্যাপক অমল রায়চৌধুরীর কাজ বারবার বিশ্লেষিত ও আলোচিত হবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =