পৃথিবী যত দ্রুত উষ্ণ হবে, বাস্তুতন্ত্রও তত দ্রুত বদলাবে—এটাই এতদিন অনেক পরিবেশবিদের সরল ধারণা ছিল। যুক্তিটাও সোজা- জলবায়ু বদলালে পুরনো প্রজাতি টিকে থাকতে পারবে না, তারা সরে যাবে, নতুন প্রজাতি এসে জায়গা নেবে। ফলে একটি এলাকার জীবসমষ্টি দ্রুত পাল্টে যাবে। কিন্তু লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তব চিত্র অতটা সহজ নয়। গবেষকেরা স্থলভাগ, মিষ্টিজল ও সমুদ্রের প্রায় একশো বছরের জীববৈচিত্র্য সমীক্ষা ও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন-“টার্নওভার”। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সময়ের সঙ্গে প্রজাতির তালিকা কত দ্রুত বদলায়। ধরা যাক একটি বন, একটি হ্রদ বা সমুদ্রের তলদেশের একটি অংশ। যদি টার্নওভার বেশি হয়, তাহলে সেখানকার প্রজাতি দ্রুত বদলাবে। যদি কম হয়, তাহলে বছর বছর একই প্রজাতি টিকে থাকবে। ১৯৭০-এর দশক থেকে বিশ্ব উষ্ণায়নের গতি বেড়েছে, এটা আমরা জানি। তাই গবেষকেরা উষ্ণায়ন বাড়ার আগে ও পরে টার্নওভারের হার তুলনা করেছেন। বিশেষ করে ১ থেকে ৫ বছরের ছোট সময়সীমায়, যেখানে দ্রুত পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব ধরা পড়ার কথা। ফলাফল ছিল অপ্রত্যাশিত। টার্নওভার বাড়েনি, বরং কমেছে। স্থলচর পাখি থেকে সমুদ্রতলের জীব – সব ক্ষেত্রেই একই প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান গবেষক ড. ইমানুয়েল নওয়াঙ্কো বলেন, “প্রকৃতি যেন এক স্ব-মেরামতকারী ইঞ্জিন। পুরনো অংশ খুলে নতুন অংশ বসায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সেই ইঞ্জিন এখন ধীরে চলছে।”
সাধারণভাবে বাস্তুতন্ত্রের ভেতরে একটি স্বাভাবিক পরিবর্তনের ধারা থাকে। প্রতিযোগিতা, শিকার-শিকারি সম্পর্ক, রোগ বা নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে প্রজাতি আসা-যাওয়া করে। এমনকি পরিবেশ খুব বেশি না বদলালেও এই পরিবর্তন চলতেই থাকে। কিন্তু যখন এই পরিবর্তনের গতি বাড়ার কথা, তখনই তা কমে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে টার্নওভার এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। এ কিন্তু ছোট পরিবর্তন নয়, বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। গবেষকেরা বলছেন, বাস্তুতন্ত্র শুধু তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত বা দূষণ প্রভৃতি বাইরের কারণে বদলায় না। ভেতরেও নানা সম্পর্ক কাজ করে। ২০১৭ সালে পদার্থবিদ গাই বুনিন “মাল্টিপল অ্যাট্রাক্টরস” নামে একটি ধারণা দেন। এতে বলা হয়, কোনো একটি জায়গায় একটিমাত্র স্থিতিশীল অবস্থা থাকে না। বরং একাধিক সম্ভাব্য বিন্যাস তৈরি হতে পারে। প্রজাতিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা, শিকার-পালটা শিকার, এসব এক চক্রবৎ সম্পর্ক তৈরি করে। যেমন কোনো কোনো খেলায় কেউ চিরকাল জেতে না, একজন অন্যজনকে হারায়, আবার নিজেও কারও কাছে হারে। এভাবেই ভারসাম্য ঘুরে ঘুরে বদলায়। যদি এই ভেতরের পরিবর্তনই বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হয়, তবে সেটাই এখন ধীর হয়ে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? গবেষকেরা বলছেন, এর বড় কারণ হতে পারে পরিবেশের অবক্ষয় এবং আঞ্চলিক প্রজাতির সংখ্যা হ্রাস। একটি সুস্থ পরিবেশে আশপাশে অনেক সম্ভাব্য নতুন প্রজাতি থাকে, যারা সুযোগ পেলে ঢুকতে পারে। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ, অতিরিক্ত শিকার ইত্যাদির ফলে সেই সম্ভাব্য প্রজাতির ভাণ্ডার ছোট হয়ে যাচ্ছে। ফলে যখন কোনো প্রজাতি হারিয়ে যায়, তাকে প্রতিস্থাপন করার মতো বিকল্প কমতে থাকে। এতে বাস্তুতন্ত্র শান্ত বা স্থিতিশীল হয় না বরং আটকে যায়। তার পুনর্গঠনক্ষমতা ও সহনশীলতা কমে যায়। তাই স্থানীয় জীবসমাজ কম বদলাচ্ছে মানেই কিন্তু ভালো খবর নয়। হয়তো এ এক সতর্ক সংকেত । যদি বাস্তুতন্ত্র ধাক্কা সামলাতে প্রজাতির বদলের ওপর নির্ভর করে, তাহলে এই ধীরগতি ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে “স্থিতি” আসলে “ক্ষয়।” পরিবর্তন থেমে যাচ্ছে, কারণ বদলানোর মতো যথেষ্ট প্রজাতিই আর নেই।
সূত্র : Earth. com; February 2026
