শিশুর খাদ্যাভ্যাস ও বৃদ্ধি-বিকাশ 

শিশুর খাদ্যাভ্যাস ও বৃদ্ধি-বিকাশ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথম দুই বছর তার জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়। এই সময়ে পুষ্টির সামান্য ঘাটতিও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বহু পরিবার, যারা মাছ, মাংস, ডিমের পাশাপাশি দুধ,ঘি,দই ও খান না, নিরামিষাশী জীবনধারা বেছে নেন, তাঁরা প্রায়ই দুশ্চিন্তায় ভোগেন যে, প্রাণীজ খাবার ছাড়া কি শিশু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে?

এই উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এক বৃহৎ পরিসরের নতুন বিশ্লেষণ আশ্বস্ত করার মতো বার্তা দিয়েছে। প্রায় ১২ লক্ষ শিশুর স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে কেরেম অ্যাভিটাল–এর নেতৃত্বে এক গবেষকদল দেখেছেন, নিরামিষাশী এবং আমিষভোজী পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের ওজন, উচ্চতা ও মাথার পরিধি এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকই—দুই বছর বয়সে প্রায় একই গতিপথ অনুসরণ করে। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল নেগেভের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলের হাজারো নিয়মিত ক্লিনিক ভিজিটের তথ্যের ভিত্তিতে।

জন্মের পর শুরুর মাসগুলোতে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রথম দুই মাসে নিরামিষাশী পরিবারের কিছু শিশুর ওজন তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে এই ব্যবধান সামান্য এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা প্রায় মিলিয়ে যায়। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর সেই পার্থক্য আর পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ থাকে না। গবেষকেরা আরও লক্ষ্য করেন, নিরামিষাশী পরিবারের শিশুদের জন্মের সময় ওজন ও উচ্চতা গড়ে সামান্য কম ছিল। জন্মকালের এই প্রাথমিক পার্থক্যই পরবর্তী চেকআপে কিছু বিচ্যুতি তৈরি করেছিল। পরে তা স্বাভাবিক বৃদ্ধির ধারায় সামঞ্জস্য পায়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব খাদ্যগোষ্ঠীতেই বয়সোচিত উচ্চতার অস্বাভাবিক ঘাটতির প্রবণতা খুবই বিরল, প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডে এই হার স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই । অর্থাৎ, এটাই বোঝা গেল যে শিশুর বৃদ্ধি কেবল খাবারের ধরন নয়, তার গুণমান ও যত্নশীল পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।

তবে এই গবেষণাটি একটি সতর্ক বার্তাও দিয়েছে। নিরামিষাশী খাদ্যতালিকায় ভিটামিন বি১২–এর প্রাকৃতিক উৎস অনুপস্থিত থাকে । তাই নিরামিষাশী খাদ্যাবলম্বী শিশুদের জন্য পরিপূরক বা শক্তিদায়ক খাবার অপরিহার্য। দ্রুত বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য ক্যালরি, প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি পুষ্টি নিশ্চিত করা চাই। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও পুষ্টিবিদের পরামর্শই একজন গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে স্তন্যদায়ী মা এবং তার শিশু ও পরিবারের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে।

এই বিশাল উপাত্তের বিশ্লেষণ আমাদের একটি পরিণত বার্তা দেয় যে, উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য যদি সচেতন পরিকল্পনা, পুষ্টিজোগান ও চিকিৎসা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি হতে বাধ্য। তবে শুধু দুই বছর না, তার পরেও হাড়ের স্বাস্থ্য, বোধবুদ্ধির বিকাশ ও খাদ্যের গুণমান কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বোঝার জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

 

সূত্র: Growth Trajectories in Infants From Families With Plant-Based or Omnivorous Dietary Patterns by Kerem Avital , Naomi Fliss-Isakov, et.al; published in the journal JAMA Network Open, 13th February 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × one =